ট্রেন যাত্রায় নতুন গতি! শিয়ালদহ ডিভিশনে ডিজিটাল সিগন্যালিং ও আন্ডারপাস নির্মাণে বিপ্লব

শিয়ালদহ ডিভিশনে এক নজিরবিহীন প্রকৌশলগত সাফল্য অর্জিত হলো। মাত্র ২৪ ঘণ্টার এক সমন্বিত মেগা-ব্লক অভিযানের মাধ্যমে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্ব রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার মিলিন্দ দেওসকরের নেতৃত্বে সম্পন্ন এই অভিযানে রিইনফোর্সড কনক্রিট আন্ডারপাস বা সাবওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে দুটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিং স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেবগ্রাম স্টেশনে চালু করা হয়েছে অত্যাধুনিক ডিজিটাল সিগন্যালিং ব্যবস্থা।

এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল বেলডাঙ্গা ও সরগাছির মধ্যবর্তী ১১৯/ই এবং দেবগ্রাম ও পাগলা চণ্ডীর মধ্যবর্তী ৯৮/টি—এই দুটি লেভেল ক্রসিং গেটকে রেল মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে ফেলা। অত্যন্ত সীমিত সময়ের মধ্যে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে রেলের প্রযুক্তিবিদরা দুটি ৩৫০ টনের রোড ক্রেন, পাঁচটি পোকলেইন এক্সকাভেটর এবং ভারী ব্যাক-আপ ক্রেন ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে ২০টি বিশালাকার আরসিসি (RCC) বক্স এবং ১৮টি বেস স্ল্যাব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে স্থাপন করা হয়েছে। বর্ষাকালে এই আন্ডারপাসগুলো যাতে জলমুক্ত ও টেকসই থাকে, সেজন্য পলিউরিয়া সারফেস কোটিং এবং জিওটেক্সটাইল শিটের সাহায্যে অত্যাধুনিক ওয়াটারপ্রুফিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রকৌশলগত উন্নতির পাশাপাশি ট্র্যাকের মানোন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরগাছি স্টেশনে ৪৫৫ মিটার রেললাইন পরিবর্তনের পাশাপাশি ভারী ট্র্যাক শিফটিং-এর কাজ শেষ করা হয়েছে। বহরমপুর কোর্ট ও সরগাছির মধ্যে পুরনো ৫২ কেজি ওজনের ট্র্যাকের বদলে আধুনিক ৬০ কেজি স্ট্যান্ডার্ড ট্র্যাক বসানো হয়েছে, যা ট্রেনের গতি ও নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বৈদ্যুতিক বিভাগের কর্মীরা ওভারহেড ট্র্যাকশন লাইনের পুঙ্খানুপুঙ্খ সংস্কার করেছেন, যার মধ্যে ৪০টি ক্যান্টিলিভার অ্যাসেট এবং ৮৬টি ইনসুলেটর পরিষ্কারের কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ডিজিটাল রূপান্তরের পথে এক ধাপ এগিয়ে দেবগ্রাম স্টেশনে নতুন সিমেন্স (MK-II) ইলেকট্রনিক ইন্টারলকিং ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। কোনও আউটডোর পরিবর্তন ছাড়াই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই ব্যবস্থা চালু হওয়ায় এখন থেকে ৩৫টি ট্রেন রুট স্বয়ংক্রিয় ও সুরক্ষিত হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এফট্রনিক্স ডেটালগার এবং স্বয়ংক্রিয় অগ্নি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, যা রেল যাত্রাকে আরও নিরাপদ করে তুলবে।

শিয়ালদহের ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার (DRM) রাজীব সাক্সেনা বলেন, “এই মেগা-ড্রাইভটি আমাদের ডিভিশনের জন্য এক ঐতিহাসিক মোড়। ব্যস্ত লেভেল ক্রসিংগুলো বন্ধ হওয়ায় সড়ক ও রেলের সংঘর্ষের ঝুঁকি চিরতরে দূর হলো। উন্নত ট্র্যাক এবং ডিজিটাল সিগন্যালিং এখন ট্রেনের গতি ও যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্যকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।”

এই আধুনিকীকরণের সুফল সরাসরি পাবেন সাধারণ যাত্রীরা। লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে ট্রেনকে আর গতি কমাতে হবে না, ফলে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। একইসঙ্গে, সড়ক ও রেল যোগাযোগ পৃথক হয়ে যাওয়ায় যানজট ও দুর্ঘটনা—উভয়ই কমবে, যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy