এক সময় চারিদিকে ছিল ঘন ঝোপঝাড় আর অরণ্যের নিস্তব্ধতা। সেই জঙ্গলের মধ্যে এক প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের নীচে আজও পূজিত হন মা ডাকাত কালী। পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম-২ ব্লকের গঙ্গাটিকুরি পঞ্চায়েতের বহড়ান গ্রামের এই ‘ডাকাত কালী’ পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় সাড়ে চারশো বছরেরও বেশি পুরনো এক হাড়হিম করা ইতিহাস।
গ্রামের সাধারণ গ্রাম্য দেবীই কীভাবে পরিণত হয়েছিলেন এক দুর্ধর্ষ ডাকাত সর্দারের আরাধ্যা দেবী কালী—জানুন সেই কাহিনি।
ডাকাত পরেশ হাজরার সাধনা
গ্রামবাসী সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিনশো বছর আগে গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে বসবাস করতেন এক দুর্ধর্ষ ডাকাত সর্দার পরেশ হাজরা। তাঁর নাম শুনলেই মুর্শিদাবাদ ও বর্ধমান সীমান্তে বিস্তৃত এলাকায় আতঙ্ক ছড়াত।
পূজার সূচনা: প্রতিটি অভিযানের আগে পরেশ হাজরা তাঁর দলবল নিয়ে গ্রামের অশ্বত্থ গাছতলায় পূজিত সেই গ্রাম্য দেবী মা কালীর পুজো করতেন। পরে প্রতি বছর নিজের বাড়ির পাশাপাশি সেই অরণ্যের থানেও তিনি মা কালীর ধুমধাম সহকারে পুজো করতেন।
নামকরণ: ধীরে ধীরে সেই গ্রাম্য দেবীই পরিচিতি পান আজকের ‘ডাকাত কালী’ নামে।
গ্রামবাসী রণবীর সিনহা বলেন, “যেখানে মায়ের এখন পুজো হয় এই জায়গা পুরোটাই জঙ্গলে ভরা ছিল। এটাই আমাদের গ্রাম্য দেবী নামে পরিচিত ছিল। পরেশ হাজরা নামের এক ডাকাত ছিলেন তিনি এখানে পুজো দিয়ে সাধনা করে বেরিয়ে যেতেন কাজে। সেই থেকেই মায়ের নাম হয়ে গেল ডাকাতকালী।”
আজও প্রচলিত সেই প্রাচীন প্রথা
আজও বহড়ানের ডাকাত কালী পুজোয় প্রচলিত রয়েছে বহু প্রাচীন এবং অনন্য এক রীতি।
অনন্য নৈবেদ্য: পুজোর প্রথম নৈবেদ্য আসে পুরনো ডাকাত পরিবারের সদস্যদের হাত থেকে। তাঁদের মাধ্যমেই ‘চুরি করা চালকুমড়ো’ মায়ের কাছে নিবেদন করা হয়।
পূজার রীতি: পুজো হয় তন্ত্রমতে, যেখানে মায়ের ভোগে থাকে সাত রকমের ভাজা, ঘি-ভাত, খিচুড়ি, পায়েস-সহ নানা উপাচার।
আজিমগঞ্জ-কাটোয়া রেলপথের বহড়ান স্টেশন থেকে সামান্য দূরেই মায়ের আস্তানা। আগে যেখানে ছিল ঘন জঙ্গল, আজ সেখানে কংক্রিটের পরিবেশ। তবে অশ্বত্থ গাছটি আজও অটুট, তার তলাতেই নির্মিত হয়েছে পাকা বেদি। কোনও মন্দির গড়ে ওঠেনি। খোলা আকাশের নিচে সেই একই জায়গায় হয় বহড়ানের ডাকাত কালী পুজো।
পূজা কমিটির সদস্য অমিতাভ সরকার জানান, “কালীপুজোর দিনে এই মন্দির প্রাঙ্গণ পুরো ভর্তি হয়ে থাকে। মুর্শিদাবাদ, বীরভূম থেকে লক্ষাধিক ভক্তবৃন্দরা আসেন পুজো দিতে।” গ্রামের মানুষের অটুট বিশ্বাস, ‘মা ডাকাত কালী কাউকে খালি হাতে ফেরান না’।