গাজা সিটি: ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজা উপত্যকায় সহিংসতা থামছে না। সম্প্রতি হামাস এবং বিভিন্ন শক্তিশালী ফিলিস্তিনি গোত্রগুলির (Clans) মধ্যে সংঘর্ষে দুই ডজনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, হামাস প্রকাশ্য স্কোয়ারে চোখ বাঁধা পুরুষদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বলেও খবর।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের পূর্বনির্ধারিত যুদ্ধবিরতি রেখায় ফিরে যাওয়ার পর, হামাস সদস্যরা গাজার ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছে। কিন্তু এই সুযোগে গাজার কিছু প্রভাবশালী গোত্রও ক্ষমতার জন্য লড়াই শুরু করেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ হামাসের আদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বী পশ্চিম তীর-ভিত্তিক ফাতাহ আন্দোলনের মিত্র, আবার কেউ কেউ ইসরায়েলের সমর্থনপুষ্ট বলে জানা যাচ্ছে।
কারা এই গোত্রগুলি?
শতাব্দী ধরে ফিলিস্তিনি সমাজে পারিবারিক গোত্রগুলি বিদ্যমান। সাম্প্রতিক দশকগুলিতে তারা ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
দুগমুশ গোত্র (Dughmush Clan): গাজা সিটির এই গোত্রটি সবচেয়ে বড় এবং অন্যতম সুসজ্জিত অস্ত্রধারী। এর নেতৃত্বে রয়েছেন মুমতাজ দুগমুশ। যুদ্ধবিরতির পরই হামাস এই গোত্রটিকে লক্ষ্য করে অভিযান শুরু করে।
আল-মাজায়দা গোত্র (al-Majayda clan): খান ইউনুসের কিছু অংশে এই গোত্রের প্রভাব রয়েছে। যদিও শুরুতে হামাস এই এলাকায় অভিযান চালিয়েছিল, তবে সম্প্রতি এই গোত্রটি গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে হামাসের প্রচেষ্টাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হামাস এবং ফাতাহ উভয়ের সদস্যরাই কোনো না কোনো গোত্রের অংশ। এই গোত্রগুলির আনুগত্য অনেক সময় রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের চেয়েও শক্তিশালী হয়।
কিসের ভিত্তিতে এত ক্ষমতাশালী এই গোত্রগুলি?
১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর যখন প্রায় ৭,৫০,০০০ ফিলিস্তিনি গাজা উপত্যকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, তখন থেকেই এই গোত্রগুলি মধ্যস্থতাকারী ও পৃষ্ঠপোষক হিসাবে প্রথাগত ভূমিকা নিতে শুরু করে। তাদের সুসংগঠিত কাঠামো বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি সমাজকে সহায়তা ও কল্যাণমূলক কাজ প্রদানে সক্ষম ছিল।
কিন্তু পরে প্রথম ও দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময়, যখন ইসরায়েল ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনী ও অবকাঠামোর বেশিরভাগ ধ্বংস করে দেয়, তখন এই গোত্রগুলি আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে গাজা উপত্যকায়, হামাস বা ফাতাহ কেউই যখন ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি, তখন এই গোত্রগুলি সামরিক সংগঠনে রূপান্তরিত হয়ে সেই শূন্যস্থান পূরণ করে।
২০০৬ সালে হামাস নির্বাচনে জেতার পর, ফাতাহ-সমর্থিত কিছু গোত্র তাদের ক্ষমতা গ্রহণ আটকাতে চেয়েছিল। ২০০৭ সালে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরও প্রায় এক বছর লেগেছিল শক্তিশালী গোত্রগুলিকে নিজেদের অধীনে আনতে।
হামাসের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কি গোপনে সাহায্য করছে ইসরায়েল?
৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণে গাজা উপত্যকা বিধ্বস্ত হয়ে যায়, এবং আবারও নিরাপত্তার চরম অভাব দেখা দেয়। এখন ইসরায়েলের আংশিক সেনা প্রত্যাহারের পর নতুন করে নিরাপত্তার শূন্যতা তৈরি হয়েছে, আর অনেক গোত্র তা পূরণ করতে চাইছে—কারও কারও ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সাহায্য নিয়েই।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জুন মাসে স্বীকার করেছিলেন যে তাঁর সরকার গাজার কিছু গোত্র, গ্যাং ও মিলিশিয়াদের, যেমন ইয়াসির আবু শাবাবের নেতৃত্বাধীন পপুলার ফোর্সেস-কে অস্ত্র সরবরাহ করছে। নেতানিয়াহু-র যুক্তি ছিল, হামাসের যেকোনো বিরোধিতা ইসরায়েলকে সাহায্য করবে।
যুদ্ধবিরতির পর হামাস এখন এই ইসরায়েল-সহযোগিতাকারী গোত্রগুলিকে “সহযোগী ও বিশ্বাসঘাতক” আখ্যা দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করেছে। অন্যদিকে, পপুলার ফোর্সেস অস্ত্র ছাড়তে অস্বীকার করেছে। হোসাম আল-আস্তালের নেতৃত্বে এক ডজনেরও বেশি নতুন মিলিশিয়া গ্রুপও গজায় তৈরি হয়েছে।
আল-আস্তাল বলেছেন: “হামাস সবসময় বাজি ধরেছিল যে গাজায় তাদের বিকল্প কেউ নেই, কিন্তু আজ আমি বলছি, হামাসের বিকল্প শক্তি আজ বিদ্যমান। আমি বা আবু শাবাব কিংবা অন্য যে কেউ হতে পারে, কিন্তু বিকল্প আজ আছে।”
গাজার ভবিষ্যতের শাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায়, এই শক্তিশালী গোত্রগুলি আবারও বিকল্প রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে, যেমনটা দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় হয়েছিল। এর ফলে গাজা আরও বিভক্ত হবে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পক্ষে এই এলাকাগুলিকে এক ছাতার নিচে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতি গাজায় শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বাস্তব বিপদ তৈরি করছে।