বিপুল ঋণের বোঝা, ব্যবসায় চরম লোকসান—এই পরিস্থিতির চাপে পড়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন এক ব্যক্তি। অভাবের তাড়নায় প্রথমে নিজের কিডনি বিক্রির কথা ভেবেছিলেন তিনি, কিন্তু সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় দ্রুত মোটা টাকা উপার্জনের জন্য বেছে নিলেন অপরাধের পথ। কলকাতার বিশিষ্ট চিকিৎসকদের হুমকি চিঠি পাঠিয়ে তোলাবাজি করার ছক কষেছিলেন অসমের বাসিন্দা শিবতোষ দেবরায়। দীর্ঘ তদন্তের পর অবশেষে কলকাতা পুলিশের জালে ধরা পড়লেন এই ‘প্রতারক’। রবিবার অসমের লামডিং থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের এপ্রিল মাসে। কলকাতার একাধিক নামী হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের কাছে একের পর এক হুমকি চিঠি আসতে শুরু করে। চিঠিগুলিতে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছিল। এই ঘটনায় চিকিৎসক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তের দায়িত্বভার তুলে নেয় কলকাতা পুলিশ।
তদন্তকারীরা প্রথমেই নজর দেন শহরের বিভিন্ন ডাকঘর ও হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজের দিকে। শতাধিক ঘণ্টার ফুটেজ তন্ন তন্ন করে খতিয়ে দেখার পর পুলিশ একটি ক্লু পায়—মাস্ক পরা এক ব্যক্তিকে বারবার বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে। তাঁর গতিবিধি বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হন যে, এই ঘটনার পেছনে একজনই ব্যক্তি রয়েছে। এরপর শুরু হয় প্রযুক্তিগত তদন্ত। মোবাইল ফোনের কল ডিটেলস, লোকেশন ট্র্যাকিং এবং ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, হুমকি চিঠিগুলি পাঠানো হচ্ছে কলকাতার জেনারেল পোস্ট অফিস (জিপিও) থেকে।
জিপিও-র তথ্য ধরে এগোতেই তদন্তকারীরা অভিযুক্তের ঠিকানায় পৌঁছে যান। তদন্তের জাল গিয়ে শেষ হয় অসমের লামডিং এলাকায়। পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ হাতে পাওয়ার পর কলকাতা পুলিশের একটি বিশেষ দল অসমে অভিযান চালিয়ে শিবতোষ দেবরায়কে গ্রেফতার করে। ধৃতকে ট্রানজিট রিমান্ডে কলকাতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রাথমিক জেরায় পুলিশের সামনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। শিবতোষ একসময় হোটেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসানের ফলে তিনি ঋণের জালে আটকে পড়েন। ধারের টাকা পরিশোধ করার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি, কিডনি বিক্রি করে ১৫ লক্ষ টাকা জোগাড় করার পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সুযোগ না পাওয়ায় সহজ পথে টাকা হাতানোর জন্য তিনি কলকাতার চিকিৎসকদের নিশানা করেন।
পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, এই অপরাধের পেছনে শিবতোষ একাই ছিলেন, নাকি তাঁর কোনো সহযোগী রয়েছে। চিঠি লেখা বা পাঠানোর ক্ষেত্রে কারোর মদত ছিল কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এই গ্রেফতারির ফলে কলকাতার চিকিৎসক মহলে আপাতত স্বস্তি ফিরেছে। তবে ঘটনার নেপথ্যে আর কোনো বৃহত্তর চক্র কাজ করছে কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত জেরার অপেক্ষায় রয়েছেন তদন্তকারীরা।





