কলকাতায় লিওনেল মেসির সফর ঘিরে যে নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি ও বিশৃঙ্খলার সাক্ষী হয়েছিল ফুটবলপ্রেমীরা, তার তদন্তে এবার কোমর বেঁধে নামছে নবগঠিত বিজেপি সরকার। রাজ্যের নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেই প্রাক্তন ফুটবল তারকা তথা কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ নিশীথ প্রামাণিক কড়া বার্তা দিলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, মেসির সফরের নামে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা যারা আত্মসাৎ করেছে এবং যারা এই চরম অব্যবস্থার নেপথ্যে ছিল, তাদের কারোরই রেহাই নেই।
তদন্তের নির্দেশ ও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক:
মঙ্গলবার নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিশীথ প্রামাণিক বলেন, “মেসি-কাণ্ড বাংলার ক্রীড়া জগতের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। সাধারণ মানুষ বিপুল টাকা খরচ করে টিকিট কেটেছিলেন শুধু এক ঝলক ফুটবল জাদুকরকে দেখার জন্য। কিন্তু তাঁদের বঞ্চিত করা হয়েছে। আমি ইতিমধ্যেই এই সংক্রান্ত সমস্ত ফাইল চেয়ে পাঠিয়েছি। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনে আমি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে আলোচনা করব।”
আগের সরকারের ‘অন্তর্ঘাত’ ও টাকা ফেরতের আশ্বাস:
তৃণমূল সরকারের জমানায় মেসি ভক্তদের টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এই প্রসঙ্গে ক্ষোভ উগরে দিয়ে ক্রীড়ামন্ত্রী বলেন, “আগের সরকার সব ক্ষেত্রেই অন্তর্ঘাত করেছে। শুধু ক্রীড়া নয়, আইনশৃঙ্খলার যে ক্ষতি তারা করেছে তা অপূরণীয়। সাধারণ দর্শকদের টিকিটের টাকা কেন ফেরত দেওয়া হলো না, সেই কৈফিয়ত দিতে হবে। যাঁরা ওই ইভেন্টের আয়োজক ছিলেন এবং যে কর্মকর্তাদের গাফিলতিতে পরিস্থিতি হাতের বাইরে গিয়েছিল, প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “যাঁদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনে কলকাতায় ভবিষ্যতে এমন কোনো বড় আন্তর্জাতিক ম্যাচের আয়োজন করা হবে, যাতে সেই আক্ষেপ ও ক্ষতি পূরণ হয়ে যায়।”
কী ঘটেছিল যুবভারতীতে?
গত বছর ১৩ ডিসেম্বর ‘জি.ও.এ.টি ট্যুর অফ ইন্ডিয়া ২০২৫’-এর অংশ হিসেবে লুই সুয়ারেজ ও ডি পলের সঙ্গে কলকাতায় এসেছিলেন মেসি। সল্টলেক যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ভিড় উপচে পড়েছিল। কিন্তু আয়োজক শতদ্রু দত্ত ও তৎকালীন প্রশাসনের অব্যবস্থার জেরে অনুষ্ঠানটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দুই ঘণ্টার ইভেন্ট আধ ঘণ্টাও চলেনি। অভিযোগ উঠেছিল, সাধারণ দর্শকদের দূরে সরিয়ে রেখে তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা ও ঘনিষ্ঠরা মেসিকে ঘিরে ধরেছিলেন। এর ফলে গ্যালারি থেকে দর্শকরা কিছু দেখতে না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। মাঠের দিকে চেয়ার ও বোতল ছোড়া হয়, চলে ব্যাপক ভাঙচুর। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে মেসি দ্রুত মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন।
আইনি পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক রদবদল:
এই ঘটনার পরেই তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের হাত থেকে দায়িত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। গ্রেপ্তার করা হয়েছিল মূল আয়োজক শতদ্রু দত্তকে। বর্তমানে শতদ্রু জামিনে থাকলেও মামলাটি বিচারাধীন। নিশীথ প্রামাণিক দায়িত্ব নেওয়ার পর এই মামলার গতি বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন সরকার কি তবে এবার সত্যিই ফুটবলপ্রেমীদের চোখের জল মুছিয়ে টাকা ফেরত দিতে পারবে? উত্তরের অপেক্ষায় গোটা বাংলা।





