ইরানের রাজনীতিতে মাহমুদ আহমাদিনেজাদ একসময় পরিচিত ছিলেন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোরতম কণ্ঠস্বর হিসেবে। তাঁর “ইসরায়েল মানচিত্র থেকে মুছে যাবে” বা হলোকাস্ট নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যে উত্তাল হয়েছে বিশ্বরাজনীতি। কিন্তু সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এমন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের সম্ভাব্য নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসময় খোদ আহমাদিনেজাদকেই বিবেচনা করেছিল।
দীর্ঘদিন ধরে চরম ইসরায়েলবিরোধী হিসেবে পরিচিত এই নেতার সাথে কেন আমেরিকা ও ইসরায়েল গোপন সমঝোতার কথা ভেবেছিল? এটি কি কোনো বড় রাজনৈতিক চাল ছিল? বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল আহমাদিনেজাদকে ইরানের বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে বের করে আনা। কিন্তু টাইমস জানিয়েছে, যুদ্ধের শুরুতে তাঁকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য চালানো একটি বিশেষ হামলায় তিনি আহত হন, যার ফলে এই গোপন পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়ে। যদিও আহমাদিনেজাদ বা তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি, এবং বর্তমানে তাঁর অবস্থানও রহস্যের আবরণে ঢাকা।
অনেকের কাছেই এই ঘটনাটি এক প্রবল বৈপরীত্যের জন্ম দিয়েছে। যে ব্যক্তি বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন, তাঁকে কেন ভবিষ্যতে ইরান শাসনের যোগ্য বলে মনে করা হয়েছিল? কিছু ইসরায়েলি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক দীর্ঘকাল ধরেই মনে করতেন, আহমাদিনেজাদের উগ্র বক্তব্য আসলে ইসরায়েলের জন্যই সুবিধাজনক ছিল। মোসাদের সাবেক প্রধান এফ্রাইম হালেভি একবার তাঁকে “ইসরায়েলের জন্য ইরানের সবচেয়ে বড় উপহার” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কারণ, আহমাদিনেজাদের চরমপন্থা বিশ্বকে ইরানের পারমাণবিক হুমকিকে আরও গুরুত্ব সহকারে নিতে বাধ্য করেছিল।
তবে আহমাদিনেজাদের সমর্থকেরা এই দাবিকে বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের মতে, তিনি কোনো প্রোপাগান্ডা বা গোপন বোঝাপড়ার অংশ ছিলেন না, বরং তাঁর আদর্শিক ও আক্রমণাত্মক নীতিই ছিল তাঁর রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। ২০০৫ সালে তেহরানের মেয়র থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই ও সরলতার স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এলেও, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে মূলত ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্যের মাধ্যমেই।
আজকের এই নতুন তথ্য সামনে আসার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আহমাদিনেজাদের ভাবমূর্তি কি সবসময়ই এতটা সরল ছিল? তিনি কি সত্যিই কেবল একজন আদর্শিক নেতা, নাকি পর্দার আড়ালে এক জটিল রাজনৈতিক খেলার গুটি? নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনটি কেবল আহমাদিনেজাদের ব্যক্তিগত রাজনীতি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ও রহস্যময় কূটনীতির নতুন এক অধ্যায় উন্মোচন করেছে।





