২০২৪ সালের ৯ অগাস্ট। ক্যালেন্ডারের পাতায় এই তারিখটা আর পাঁচটা দিনের মতোই আসতে পারত, কিন্তু তা আসেনি। কলকাতার বুকে আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত এক তরুণী চিকিৎসককে যেভাবে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছিল, তা স্তব্ধ করে দিয়েছিল গোটা দেশকে। নারী নিরাপত্তার দাবিতে গর্জে উঠেছিল তিলোত্তমা। রাত দখল, রাস্তা দখলের সেই নজিরবিহীন আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বের কোণায় কোণায়। সদ্যোজাত সন্তানকে কোলে নিয়েও মায়েদের রাস্তায় নামার সেই দৃশ্য আজও রাজ্যবাসীর স্মৃতিতে দগদগে। আরজি করের সেই বিচার চেয়ে ‘জাস্টিস ফর আরজি কর’ স্লোগান রাতারাতি বদলে দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের চেনা রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণ।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর, নয়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে সেই অভয়া কাণ্ডের ফাইল আবার নতুন করে খোলা হয়েছে। আর ফাইল খুলতেই রাজ্য প্রশাসনে এক নজিরবিহীন কম্পন শুরু হয়েছে। ধামাচাপা পড়ে থাকা সত্যকে সামনে আনতে ইতিমধ্যেই তিনজন হাইপ্রোফাইল আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু চমকের এখানেই শেষ নয়। নয়া মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, আরজি কর কাণ্ডে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কোনোভাবেই রেহাই পাবেন না। সেই সময় এই জঘন্যতম অপরাধের পর রাজ্য প্রশাসন কতটা তৎপর ছিল, কেন প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ উঠেছিল এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নিজের দায়িত্ব কতটা পালন করেছিলেন, তা এবার সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খুঁটিয়ে দেখা হবে।
তদন্তকারী সূত্রের খবর, সাসপেন্ড হওয়া তিন আইপিএস অফিসারের তালিকায় রয়েছেন কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলও। বর্তমানে এই অফিসারদের কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) এবং যাবতীয় ডিজিটাল নথি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ঘটনার রাতে এবং তার পরবর্তী দিনগুলিতে কার কার সাথে এই পুলিশ কর্তাদের যোগাযোগ ছিল, তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন। ঠিক এই স্বচ্ছ ও কঠোর পদক্ষেপেরই আশা করেছিলেন অভয়ার অসহায় বাবা-মা, যা তৎকালীন সরকারের আমলে সম্পূর্ণ অধরা ছিল। উল্টে নির্যাতিতার পরিবারকে টাকার বিনিময়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা এবং লাগাতার হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল বলে অভিযোগ।
মেয়ের নৃশংস পরিণতির পর থেকে প্রতিটা দিন এবং রাত এক বুক যন্ত্রণা আর আশায় বুক বেঁধে দিন কাটাচ্ছেন অভয়ার মা-বাবা। তাঁদের চোখে আজও একটাই স্বপ্ন—কবে প্রকৃত বিচার পাবে তাঁদের মেয়ে? কবে ফাঁসি হবে সেই সব নরপশুদের? আজ নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়ায় সুবিচারের এক ক্ষীণ আলো দেখতে পাচ্ছে তিলোত্তমা। দোষীদের পাশাপাশি যারা এই অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিল, প্রমাণ নষ্ট করেছিল, তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে দিন গুনছে গোটা কলকাতা।





