ইচ্ছা আর সৃজনশীলতা থাকলে যে অকেজো সম্পদকেও আয়ের উৎসে পরিণত করা যায়, তার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠলেন উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের তুষার কান্তি মিস্ত্রি। যে পতিত জলা জমিকে একসময় এলাকার মানুষ ‘অকেজো’ বলে অবহেলা করত, আজ সেখানেই ফুটেছে হাজার হাজার সাদা ও গোলাপি পদ্ম। আর এই পদ্ম ফুলের সৌন্দর্যই এখন তুষারবাবুর পকেটে বাড়তি স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিচ্ছে। প্রথাগত ব্যবসার পাশাপাশি অভিনব এই উদ্যোগে এখন মাসে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা অতিরিক্ত রোজগার করছেন তিনি।
বসিরহাট মহকুমার বাসিন্দা তুষার কান্তি মিস্ত্রির বাড়ির পাশেই পড়েছিল একটি বড় জলা জমি। দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে কোনও চাষাবাদ না হওয়ায় জমিটি কার্যত আগাছা আর আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর আগে তুষারবাবু স্থির করেন এই জমিটিকে কাজে লাগানোর। পরীক্ষামূলকভাবে তিনি সেখানে কিছু পদ্মের ‘টিউবার’ বা কন্দ রোপণ করেন। প্রকৃতির জাদুতে ধীরে ধীরে সেই মৃতপ্রায় জলা জমিই বদলে যায় এক মায়াবী পদ্মবনে। এখন দূর থেকে তুষারবাবুর জমির দিকে তাকালে সবুজের মাঝে শ্বেত ও গোলাপি পদ্মের সমারোহ চোখে পড়ে।
বর্তমানে এই পদ্ম চাষই তাঁর আয়ের প্রধান বিকল্প উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুষারবাবু জানান, প্রতি সপ্তাহে তিনি গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০টি পদ্ম ফুল বিক্রি করেন। পাইকারি বাজারে প্রতিটি ফুলের দাম মেলে ৪ থেকে ৫ টাকা। বিশেষ করে দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো কিংবা বিবাহের মরসুমে এই ফুলের চাহিদা থাকে আকাশছোঁয়া। তখন প্রতিটি ফুলের দাম দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যায়। শুধুমাত্র ফুল বিক্রি করেই ক্ষান্ত থাকেন না তিনি, পদ্মের টিউবার এবং পাতাও বিক্রি করেন। অনেক উৎসাহী মানুষ এখন তাঁর কাছে আসছেন এই চাষের পদ্ধতি শিখতে। কেউ কেউ আবার নিজেদের জমিতে চাষ করার জন্য তাঁর কাছ থেকে বীজ বা টিউবারও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
তুষার কান্তি মিস্ত্রির এই সাফল্য এখন বসিরহাটের অনেক বেকার যুবক ও চাষিদের কাছে অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, বড় মূলধন নয়, বুদ্ধিমত্তাই ব্যবসার চাবিকাঠি। তাঁর কথায়, “সবাই যে জমিকে ফেলে রেখেছিল, একটু যত্ন নিতেই সেই জমি আজ আমার সংসার টানতে সাহায্য করছে। অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে যদি মাসে বাড়তি ১০-১২ হাজার টাকা ঘরে আসে, তবে ক্ষতি কী?” বসিরহাটের এই ‘পদ্ম-বিপ্লব’ এখন প্রমাণ করছে যে, বাংলার উর্বর মাটি আর পরিশ্রমী হাত কখনও বিফলে যায় না।





