সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা স্বামীর সঙ্গে তুমুল ঝগড়া—অনেকের ক্ষেত্রেই এরপরের দৃশ্যটা অদ্ভুতভাবে এক। কোনো কথা না বলে সোজা আলমারি খুলে বসে পড়া। অগোছালো কাপড় ভাঁজ করা, পুরোনো জিনিস সরিয়ে ফেলা বা ঘর গোছানোর মাধ্যমে যেন নিজের অজান্তেই মনকে শান্ত করার এক ‘নীরব যুদ্ধ’ শুরু হয়। বাইরে থেকে একে পাগলামি বা শিশুসুলভ মনে হলেও, মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য।
পাকিস্তানি ড্রামা থেকে বাস্তব জীবনের গল্প সম্প্রতি জনপ্রিয় পাকিস্তানি ড্রামা ‘কাফিল’-এর একটি দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ চর্চায় এসেছে। সেখানে দেখা যায়, জেবা নামের এক চরিত্র তার খালাকে দেখে হাসাহাসি করত, কারণ ঝগড়া হলেই খালা আলমারি গোছাতে বসে যেতেন। কিন্তু জীবনের কঠিন বাঁকে এসে জেবা নিজেও যখন স্বামী জামির সঙ্গে মনোমালিন্যে জড়ায়, সে দেখে নিজের অজান্তেই সে-ও আলমারি গোছাতে শুরু করেছে। যা একসময় উপহাস ছিল, তা-ই জেবার কাছে হয়ে ওঠে মনের অস্থিরতা কমানোর একমাত্র ‘থেরাপি’।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন? এ বিষয়ে বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী নুজহাত রহমান জানান, রাগ বা অভিমান থেকে মনের ভেতর যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা শরীরেও প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, “ফিজিক্যাল টেনশন বা মানসিক চাপ রিলিজ করার জন্য অবচেতন মন এমন কাজ বেছে নেয় যেখানে নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে থাকে। কাপড় ভাঁজ করা বা ঘর গোছানোর মাধ্যমে মন অন্য দিকে সরে যায়, ফলে অস্থিরতা কমে আসে।”
তবে এই অভ্যাস নিয়ে একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তিনি। নুজহাত রহমানের মতে, “অস্থির অবস্থায় খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে যাওয়া বা হুট করে কোনো বড় কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। তাই কাজ করা ভালো, তবে সচেতন থাকা জরুরি।”
জাপানিজ দর্শন ‘সেইরি সেইটন’ (Seiri Seiton) আলমারি গোছানোর এই প্রক্রিয়া অনেকটা জাপানি দর্শন ‘সেইরি সেইটন’-এর মতো। ‘সেইরি’ মানে অপ্রয়োজনীয় জিনিস আলাদা করা এবং ‘সেইটন’ মানে দরকারী জিনিস গুছিয়ে রাখা। যখন মানুষের ভেতরের জগত বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে, তখন বাইরের বস্তু (যেমন কাপড় বা ঘর) গুছিয়ে সে অবচেতনভাবে বার্তা পায় যে—সবকিছু তার আয়ত্তের বাইরে চলে যায়নি।
সব থেরাপি কাউন্সেলিং রুমে হয় না রাগ যখন ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, তখন হাত কাজ খোঁজে। আলমারির ভাঁজে কাপড় সাজানো আসলে মনের ভেতরের অপ্রয়োজনীয় কষ্টগুলোকে আলাদা করারই এক প্রতীকী রূপ। শুধু আলমারি গোছানোই নয়, অনেকের ক্ষেত্রে রান্না করা, বাগান করা বা লেখালেখিও এক ধরনের নীরব থেরাপি হিসেবে কাজ করে।
সম্পাদকীয় টিপস: পরের বার যদি দেখেন আপনার সঙ্গী বা পরিচিত কেউ ঝগড়ার পর চুপচাপ ঘর গোছাচ্ছেন, তবে তাকে উপহাস করবেন না। মনে রাখবেন, তিনি হয়তো তখন নিজের ভেঙে পড়া মনটাকে জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিছু সত্য শুরুতে অদ্ভুত মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত তা-ই মানুষের মানসিক আশ্রয়ের জায়গা হয়ে দাঁড়ায়।