সাবধান! আপনার পরিচ্ছন্ন ঘরেও টয়লেটের চেয়েও বেশি জীবাণু লুকিয়ে!

আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের ঘরবাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করি। কিন্তু আপনার সাধের পরিপাটি ঘরটি কি সত্যিই সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো অনেকের কাছেই অজানা। কারণ আপনি যতই পরিষ্কার করুন না কেন, ঘরের এমন কিছু জিনিস রয়েই যায় যেখানে জীবাণুরা ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকে। পরবর্তীতে এই জীবাণুরাই নীরবে পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আমাদের খালি চোখে ধরাও পড়ে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি বাড়িতেই এমন বেশ কিছু সাধারণ জিনিস রয়েছে যেখানে টয়লেটের চেয়েও বেশি জীবাণুর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই কিছু ভয়ানক তথ্য। আসুন, জেনে নেওয়া যাক সেই জিনিসগুলো কী কী:
১. টুথব্রাশ রাখার হোল্ডার:
বাথরুমে টুথব্রাশ রাখলে তাতে জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে, এ কথা আমরা অনেকেই জানি। তবে শুধু টুথব্রাশ নয়, এর হোল্ডারেও ব্যাকটেরিয়ার এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, এটি বাথরুমের অন্যতম নোংরা বস্তু। প্রায় ২৭ শতাংশ টুথব্রাশ হোল্ডারে কলিফর্মের (মলবাহিত ব্যাকটেরিয়া) চিহ্ন পাওয়া গেছে, যেখানে টয়লেট সিটে এর উপস্থিতি মাত্র ৫ শতাংশ! তাই নিয়মিত আপনার টুথব্রাশ হোল্ডার জীবাণুমুক্ত করুন অথবা কিছুদিন পর পর बदलিয়ে ফেলুন।
২. বাথরুম ও রান্নাঘরের ট্যাপ বা কল:
টয়লেট সিটের তুলনায় বাথরুমের ট্যাপ বা কলে ২১ গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে! আর রান্নাঘরের কলের অবস্থা আরও ভয়াবহ। সেখানে টয়লেট সিটের তুলনায় ৪৪ গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া লেগে থাকে। সমীক্ষায় জানা গেছে, ই কোলাই-এর মতো ভয়ানক ড্রাগ রেসিস্টেন্স ব্যাকটেরিয়া পাইপের মাধ্যমে সিঙ্ক ও আমাদের হাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই প্রতিদিন আপনার রান্নাঘর ও বাথরুমের সিঙ্ক এবং কল ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত করুন।
৩. স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট:
আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই ডিভাইসগুলো জীবাণুর আঁতুড়ঘর। ২০১৮ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, টয়লেট সিটের তুলনায় একটি স্মার্টফোনে ৬ গুণ বেশি জীবাণু থাকে। ৫০টি ফোনের নমুনা পরীক্ষায় গড়ে ১৪৭৯টি ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, যেখানে টয়লেট সিটে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা মাত্র ২২০টি। যাদের ফোনের ব্যাক কভার চামড়ার, তাদের ক্ষেত্রে এই জীবাণুর সংখ্যা টয়লেট সিটের তুলনায় ১৭ গুণ বেশি! ২০১৬ সালের একটি ব্রিটিশ সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় হাজার জন কর্মচারী টয়লেটে ফোন ব্যবহার করার কথা স্বীকার করেছেন। এর ফলে ফোনে মল ও মূত্রের অদৃশ্য ফোঁটা লাগে, যা পরবর্তীতে আমাদের হাতে স্থানান্তরিত হয়। তাই টয়লেটে ফোন ব্যবহার করা বন্ধ করুন এবং নিয়মিত আপনার ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক স্ক্রিন ওয়াইপ বা নরম ভেজা কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করুন।
৪. কম্পিউটারের কি-বোর্ড:
অনেকেই খেতে খেতে কম্পিউটারে কাজ করার অভ্যাসে অভ্যস্ত। এর ফলে অজান্তেই জীবাণু লেগে থাকে আপনার কি-বোর্ডে। লন্ডনের একটি অফিসের ৩৩টি কি-বোর্ড পরীক্ষা করে গবেষকরা জানিয়েছেন, একটি কি-বোর্ডে টয়লেট সিটের তুলনায় ৫ গুণ বেশি জীবাণু থাকে! তাই কম্পিউটারে কাজ করার আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন এবং আপনার কি-বোর্ড নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
৫. হাত ব্যাগ:
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় সকলেই অফিস বা অন্য কোথাও যাওয়ার সময় হাত ব্যাগ ব্যবহার করেন। এই ব্যাগও হতে পারে ব্যাকটেরিয়ার নিরাপদ আশ্রয়স্থল! ২৫টি হ্যান্ডব্যাগ পরীক্ষা করে গবেষকরা দেখেছেন, গড়ে একটি হ্যান্ডব্যাগ টয়লেট সিটের তুলনায় ১০ গুণ বেশি নোংরা! ব্যাগের হাতলে সবচেয়ে বেশি ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধে। এমনকি ব্যাগে রাখা কসমেটিকস সামগ্রীতেও প্রচুর জীবাণু থাকতে পারে। বাজারের ব্যাগে তো পেটের রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসও পাওয়া গেছে। তাই কাপড়ের ব্যাগ নিয়মিত পরিষ্কার করুন এবং প্লাস্টিক বা চামড়ার ব্যাগের ক্ষেত্রে জীবাণুনাশক ব্যবহার করুন।
৬. ওয়াশিং মেশিন:
একটি ব্যবহৃত অন্তর্বাসে প্রায় ১০ কোটি ই কোলাই ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা ডায়রিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ওয়াশিং মেশিনে অন্যান্য কাপড়ের সঙ্গে অন্তর্বাস ধোয়ার ফলে সেই ব্যাকটেরিয়া অন্য কাপড়েও ছড়িয়ে যায়। ফ্রন্ট লোডিং ওয়াশিং মেশিনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, কারণ এর নিচের দিকে জল জমে থাকে, যা ব্যাকটেরিয়ার পছন্দের স্থান। অন্যদিকে টয়লেট সিট শুকনো থাকায় সেখানে তুলনামূলকভাবে কম ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া থেকে বাঁচতে প্রথমে ব্লিচ দিয়ে ওয়াশিং মেশিনের ভেতরের অংশ জীবাণুমুক্ত করুন এবং অন্তর্বাস আলাদাভাবে গরম জলে পরিষ্কার করুন।
৭. ফ্রিজের ড্রয়ার:
এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় জানা গেছে, ফ্রিজের সবজি ও মাংস রাখার ড্রয়ারটি হলো সবচেয়ে বেশি রোগ সৃষ্টিকারী মাইক্রোঅর্গ্যানিজমের আখড়া। খোলা সবজি বা মাংসের রস বিপজ্জনক জীবাণুর ধারক ও বাহক হতে পারে। তাই আপনার ফ্রিজের ড্রয়ার নিয়মিত গরম জল ও সাবান জল দিয়ে পরিষ্কার করে শুকনো করে ব্যবহার করুন।
৮. রান্নাঘরের তোয়ালে, কাপড় বা স্পঞ্জ:
রান্নাঘরেও জীবাণুর অভাব নেই। বিশেষ করে রান্নাঘরের তোয়ালে, কাপড় ও স্পঞ্জে প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে সাড়ে চার হাজার কোটি মাইক্রোবস থাকতে পারে! বাসন মোছার কাপড় ও স্পঞ্জে ই কোলাই ও অন্যান্য ফিকাল ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাই প্রতি সপ্তাহে আপনার রান্নাঘরের কাপড় ও তোয়ালে গরম জলে ধুয়ে পরিষ্কার করুন। ডিশওয়াশারে স্পঞ্জ পরিষ্কার করতে পারেন অথবা ভেজা স্পঞ্জ ৩০ সেকেন্ডের জন্য মাইক্রোওয়েভে রেখে দিন। প্রতি সপ্তাহে স্পঞ্জ ও কাপড় পরিবর্তন করাই শ্রেয়।
৯. কাটিং বোর্ড:
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, সবজি কাটার কাটিং বা চপিং বোর্ডে টয়লেট সিটের তুলনায় ২০০ গুণ বেশি জীবাণু থাকে! এমনকি মলের জীবাণুতে উপস্থিত থাকা ব্যাকটেরিয়াও কাটিং বোর্ডে পাওয়া গেছে। কাঁচা মাংস এই ব্যাকটেরিয়ার প্রধান উৎস, কারণ অধিকাংশ ফিকাল ব্যাকটেরিয়া প্রাণীর অভ্যন্তরীণ অঙ্গে থাকে। তাই কাটিং বোর্ডে মাংস কাটলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া সহজেই জমা হতে পারে। প্রতিবার ব্যবহারের পর বাসন ধোয়ার সাবান দিয়ে প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ড পরিষ্কার করুন এবং গরম জলে দুই চা চামচ ব্লিচ মিশিয়ে বোর্ডটিকে সারারাত ডুবিয়ে রাখুন। কাঠের কাটিং বোর্ডের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করুন, তবে এটিকে সারারাত জলে ডুবিয়ে রাখবেন না।
১০. পোষা প্রাণীর খাবারের পাত্র:
আপনার আদরের পোষা প্রাণীর খাবারের পাত্রেও প্রচুর পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধতে পারে। যদি আপনার কুকুর বা বিড়ালের টয়লেট সিট চাটার অভ্যাস থাকে, তবে তা আরও বিপজ্জনক। তারা টয়লেট সিট থেকে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ২৯৫টি পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়া সংগ্রহ করতে পারে। আর শুধু নিজের খাবারের পাত্রের ভেতরের অংশ চাটলেই তাদের শরীর প্রতি ইঞ্চিতে ২,১১০টি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। তাই আপনার পোষা প্রাণীর স্বাস্থ্য রক্ষা করতে এবং ঘর জীবাণুমুক্ত রাখতে প্রতিবার খাবার দেওয়ার পর পাত্রটি সাবান-জল দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
১১. টিভির রিমোট:
প্রায় প্রতিটি ঘরেই টিভি ও রিমোটের অবাধ আনাগোনা। কিন্তু ক’জন নিয়মিত এই রিমোট পরিষ্কার করেন? যদি না করে থাকেন, তবে জেনে রাখুন, টিভির রিমোট হলো হাজারো ব্যাকটেরিয়ার আশ্রয়স্থল। রিমোটের বোতামের ফাঁকে সহজেই জীবাণু আটকে যেতে পারে। তাই অ্যান্টিসেপটিক ওয়াইপ দিয়ে নিয়মিত আপনার টিভির রিমোট পরিষ্কার করুন।
১২. কার্পেট:
বাড়ির কার্পেটেও ব্যাকটেরিয়ার অভাব নেই। মৃত ত্বকের কোষ ব্যাকটেরিয়ার অন্যতম প্রিয় খাদ্য। একজন মানুষের শরীর থেকে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৫ লক্ষ মৃত ত্বকের কোষ ঝরে পড়ে। এর সঙ্গে কার্পেটে জমা হয় খাবারের অংশ, পোষ্যের লোম, ধুলো এবং অন্যান্য নোংরা। এসব কারণে কার্পেটের প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে প্রায় ২ লক্ষ ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা টয়লেট সিটের তুলনায় ৭০০ গুণ বেশি! এমনকি ই কোলাই, স্ট্যাফিলোককাস ও সালমোনেলার মতো বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়াও কার্পেটে বাসা বাঁধতে পারে। তাই আপনার কার্পেট পরিষ্কার রাখতে নিয়মিত শক্তিশালী ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করুন।
অতএব, আপনার ঘরকে সত্যিকারের জীবাণুমুক্ত রাখতে হলে শুধু নিয়মিত ঝাড়পোঁচ করলেই চলবে না, বরং এই সাধারণ জিনিসগুলোর দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে এবং সেগুলোকে নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আপনার সামান্য সচেতনতাই আপনার পরিবারকে অনেক রোগ জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।