যখন জীবনে চলার পথ অনেক কঠিন ও জটিল হয়ে যায়, তখন ঠিক কী করা উচিত? এই অবস্থায় ভালো একটি সাহিত্যের বই খুঁজে বের করে, সেটা পড়া হতে পারে সবচেয়ে ভালো কোনো প্রচেষ্টা। কিন্তু মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে, একটি বই কীভাবে আপনার জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে? এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিবিসি, ‘বিবলিওথেরাপিস্ট’ (পুস্তকীয় চিকিৎসক)-এর একটি প্যানেলকে একত্রিত করেছিল। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শগুলি নিচে তুলে ধরা হলো।
১. মানসিক চাপ কমিয়ে পুনর্জীবিত করে তোলে
সঠিক ধরনের সাহিত্য আপনাকে যেকোনো বিষয় সম্পর্কে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ দিতে সক্ষম। এটি আপনার মনকে সতেজ করে তুলতে সাহায্য করে। সাহিত্যিকদের মতে, “একটি বই মূলত আপনাকে যে বার্তাটি দেয়, সেটি হলো নিজের নীতিতে অটল থাকার। এ কারণে নানা ধরণের মানসিক পীড়া থেকে মুক্তি মেলে আর মন পুরো পরিশুদ্ধ নতুনের মতো হয়ে যায়।”
২. পালানোর সুযোগ (Escapism) দেয়, যা চলচ্চিত্রের চেয়ে শক্তিশালী
বই আপনার জীবনের নানা জটিলতা থেকে পালাতে সাহায্য করে। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় এস্কেপিজম বা পলায়নবাদ। লেখকদের মতে, “এই পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অন্য যে কোনো শিল্পের চেয়ে তীব্র ও শক্তিশালী।” একটি চলচ্চিত্র বা টিভি অনুষ্ঠানে আপনাকে ছবি দেখানো হয়, যেখানে একটি উপন্যাসের সাহায্যে আপনি সেই ছবি বা দৃশ্যপট নিজেই তৈরি করেন। সুতরাং বই আসলে অন্য যেকোনো মাধ্যমের চাইতে অনেক শক্তিশালী, কারণ এতে আপনি অনেক বেশি ব্যক্তিগতভাবে জড়িত হন।
৩. অগোছালো জীবনকে শৃঙ্খলায় আনে
বই তার কাঠামোগত বিশ্লেষণের সাহায্যে একটি অগোছালো মনে শৃঙ্খলা আনতে পারে। ঔপন্যাসিকদের অনেকেই যখন কোনো ব্যক্তিগত ঝামেলায় পড়েন, তখন তাঁরা বইয়ের সাহায্য নেন। তাঁদের মতে, “বইয়ের মধ্যে ডুবে যাওয়ার মাধ্যমে আপনি নিজের মনে থাকা নানা বিষয়কে এক জায়গায় এনে সমাধানের চেষ্টা করতে পারেন। এটি অগোছালো চিন্তাধারাকে কাঠামোগত রূপ দিতে সাহায্য করে।”
৪. হতাশ মনকে প্রবোধ দেয় এবং বাস্তবতাকে বোঝায়
একটি শক্তিশালী সাহিত্যের শেষটা আনন্দের না হলেও— বাস্তবে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। হুইটল নামের এক ঔপন্যাসিক জানান, কীভাবে দাসপ্রথার মতো কষ্টের গল্পগুলো মানুষকে সংগ্রামের মাধ্যমে টিকে থাকার ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, “দাসপ্রথার এই বিষয়টি অনেক কষ্টের আর হতাশাজনক। তবে এটি ইঙ্গিত করে যে মানুষকে কতো সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে টিকে থাকতে হয়েছে।” সাহিত্য আমাদের জীবনের হতাশার মধ্যেও ইতিবাচকতা খুঁজে নিতে শেখায়।
৫. পুনরাবৃত্তির আনন্দ: নিজেকে গভীরভাবে জানার সুযোগ
প্রিয় উপন্যাসগুলো বার বার পড়লে সেটি বিশেষ ধরনের ‘বিবলিওথেরাপি’ সরবরাহ করতে পারে। একজন পাঠকের (যিনি নিজেও লেখক) উদাহরণ টেনে বলা হয়, তিনি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একই বই (যেমন: ‘টেস অব ডি’উরবারভিল’) পড়েছেন এবং প্রতিবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।
-
উপলব্ধি: তাঁর মতে, “জীবনে চলার পথে মাঝে মাঝে আপনাকে পেছনের সময়গুলোতে টেনে নিতে পারে বই, যা অনেক বড় একটি পাওয়া। আপনি নিজের মনের স্তরগুলোয় বিচরণের সুযোগ পাবেন এই বইয়ের মাধ্যমে, যেগুলো আপনার মাথায় এতদিন পেঁয়াজের স্তরের মতো একটার সঙ্গে একটা জুড়ে ছিল।”
💡 তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যে সাহিত্যের ভূমিকা
তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কট মোকাবেলায় সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তরুণদের জন্য লেখা উপন্যাসগুলো তাদের প্রতিদিনের জীবনে বুলিং, মাদক, সমকামিতা, বা সামাজিক বর্জন-এর মতো বিষয়গুলি মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। একজন লেখক এটিকে “আমাদের মধ্যে থাকা হিমায়িত সমুদ্রকে ভেঙে দেওয়ার কুড়াল” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বই পড়ার এই মানসিক উপকারিতার পাশাপাশি, লেখার অভ্যাসও মনের মধ্যে জমে থাকা ট্রমা বা আবেগ বের করে দিতে দুর্দান্তভাবে সাহায্য করে।