‘বুকের দুধ পান, সকলের দায়িত্ব’—শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান

সন্তানের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশে মায়ের বুকের দুধের গুরুত্ব অপরিসীম। এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্বব্যাপী পালিত হয় মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। ওয়ার্ল্ড ব্রেস্টফিডিং ট্রেন্ডস ইনিশিয়েটিভ (ডাব্লিউবিটিআই) এ বছর এই সপ্তাহের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে—‘প্রটেক্ট ব্রেস্টফিডিং, এ শেয়ারড রেসপন্সিবিলিটি’ (বুকের দুধ পান রক্ষা করুন, এটি সকলের দায়িত্ব)।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মায়ের বুকের দুধ নবজাতকের জন্য একটি আদর্শ ও সম্পূর্ণ পুষ্টিকর খাবার। এটি শিশুদের শরীরে সংক্রামক রোগের আক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়ক। শুধু তাই নয়, মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশও পরিপূর্ণভাবে ঘটে।
মায়ের দুধে প্রায় ২০০টি উপাদান বিদ্যমান, যার প্রতিটিই শিশুর জন্য অত্যাবশ্যকীয়। এই উপাদানগুলো অন্য কোনো কৃত্রিম ফর্মুলা দুধে পাওয়া যায় না। গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে, জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো হলে নবজাতকের মৃত্যুর হার ২২ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, জন্মের প্রথম ৬ মাস শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত। এই সময়ে মায়ের দুধ শিশুর প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে, তাই অন্য কোনো supplementary খাবারের প্রয়োজন হয় না।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুরা মায়ের বুকের দুধ পান করে, তাদের মধ্যে অ্যালার্জি, পেটের সমস্যা এবং কানের সংক্রমণের মতো রোগ তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।
অন্যদিকে, সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুধু শিশুর জন্যই নয়, মায়ের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। এটি মায়েদের কিছু ধরনের স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।
মায়ের বুকের দুধ শিশুকে যেসব রোগ থেকে বাঁচায়:
মায়ের দুধ সরাসরি পান করার মাধ্যমে শিশুর ফুসফুস শক্তিশালী হয়।
সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, মায়ের বুকের দুধে নবজাতকের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান।
কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে জানা গেছে, মায়ের দুধ পান করলে শিশুর অ্যাজমার ঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়।
শিশু প্রতি মাসে যত দিন এবং যতটুকু দুধ পান করুক না কেন, মায়ের দুধের প্রতিটি ফোঁটাই অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোয় মায়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা:
শিশুকে স্তন পান করানো প্রসব পরবর্তী জটিলতা থেকে মায়ের শরীরকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে।
বুকের দুধ খাওয়ানো গর্ভকালীন ধকল থেকে মায়ের জরায়ুকে দ্রুত সুস্থ হতে সহায়তা করে।
বুকের দুধ খাওয়ানো প্রসব পরবর্তী রক্তপাত অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এটি মায়ের ঋতুস্রাবের চক্রকে নিয়মিত রাখতে সাহায্য করে।
বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে মায়ের সঙ্গে শিশুর গভীর মানসিক বন্ধন তৈরি হয়।
মায়ের মধ্যে ইতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টি হয়।
বুকের দুধ খাওয়ানো স্তন এবং জরায়ুর ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
বুকের দুধ খাওয়ানো প্রসব পরবর্তী সময়ে মায়ের ওজন কমাতে সাহায্য করে।
এ বছর বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের মূল প্রতিপাদ্য ‘প্রটেক্ট ব্রেস্টফিডিং, এ শেয়ারড রেসপন্সিবিলিটি’ এই বার্তাটিই বহন করে যে, মায়ের বুকের দুধের উপকারিতা রক্ষা করা কেবল মায়ের একার দায়িত্ব নয়, এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আসুন, আমরা সকলে মিলে মায়ের বুকের দুধের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করি এবং প্রতিটি শিশুকে তার প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করি।