হাত-পায়ে ঘন ঘন অবশ ভাব? অবহেলা করবেন না, হতে পারে গুরুতর রোগের লক্ষণ!

হাত বা পায়ে অবশ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি অনেকেরই হতে পারে। বাহু বা কবজির কোনো একটি স্নায়ু অথবা একগুচ্ছ স্নায়ু সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হলে হাতে অবশ ভাব দেখা দেয়। এছাড়াও ডায়াবেটিস, আঘাত, সংক্রমণ এবং বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শের কারণেও এমন অনুভূতি হতে পারে। পায়ের পাতা অবশ হওয়ার ক্ষেত্রে জ্বালাপোড়া এবং সুঁই ফোটানোর মতো অনুভূতি হতে পারে, যা মেরুদণ্ডের নীচের অংশের স্নায়ুমূলে যন্ত্রণার কারণেও হতে পারে।
এই ধরনের অনুভূতিগুলো বিক্ষিপ্তভাবে বা সরাসরি হতে পারে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অল্প সময় স্থায়ী হয়। দীর্ঘক্ষণ হাতের উপর ভর দিয়ে ঘুমালে, পায়ের উপর পা তুলে বসলে অথবা নড়াচড়া না করে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে সাময়িকভাবে অবশ ভাব অনুভূত হতে পারে। তবে যদি বারবার এমন অনুভূতি হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ এটি জটিল কোনো স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। চলুন, সেই কারণগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক:
১. ডায়াবেটিস:
ডায়াবেটিস পেরিফেরাল স্নায়ু রোগের একটি অন্যতম প্রধান কারণ। এর ফলে পায়ের পাতা অবশ হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়, যা ধীরে ধীরে উপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
২. সিস্টেমিক ডিজিজ:
এই রোগে শরীরের একাধিক অঙ্গ আক্রান্ত হতে পারে। কিডনি রোগ, ভাস্কুলার ডিজিজ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টিকারী ক্যান্সার সৃষ্টিকারী টিউমার ইত্যাদি সিস্টেমিক ডিজিজের অন্তর্ভুক্ত। এই রোগগুলোর ক্ষেত্রে ঘন ঘন হাত-পা অবশ হওয়ার অনুভূতি দেখা দিতে পারে।
৩. মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস:
প্রাথমিক পর্যায়ে অবশ ভাব হালকা থাকলেও, ঘন ঘন এমন হলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এটি মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের লক্ষণ হতে পারে, যেখানে স্নায়ুতন্ত্রের মায়োলিন সিথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ভারসাম্যের সমস্যা, মাথা ঘোরা এবং ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
৪. পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ:
এই রোগে মস্তিষ্ক, বাহু ও দেহের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীতে প্লাক জমা হয়। ফ্যাট, ক্যালসিয়াম, ফাইব্রাস টিস্যু এবং কোলেস্টেরলের কারণে প্লাক গঠিত হয়। চিকিৎসা না করালে প্লাক জমে শক্ত হয়ে ধমনীর পথ সরু করে দেয়। এর ফলে পায়ে রক্ত সরবরাহ কমে যায় এবং ঐ অংশে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যা অবশ ভাবের কারণ হতে পারে।
৫. টারসাল টানেল সিনড্রোম:
পায়ের পাতার পেছনের অংশে গোড়ালির ভেতরের দিকে এই টানেল থাকে। টিবিয়াল স্নায়ুর সঙ্কোচনের ফলে এই সিনড্রোম হয়, যা পোস্টেরিওর টিবিয়াল নিউরালজিয়া নামেও পরিচিত। চিকিৎসা না করালে গোড়ালির অসাড়তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
৬. কারপাল টানেল সিনড্রোম:
কবজির মিডিয়ান স্নায়ুতে চাপ পড়ার ফলে কারপাল টানেল সিনড্রোম দেখা যায়। এই স্নায়ুটি হাতের তালু এবং প্রথম তিনটি আঙ্গুলের অনুভূতি ও নড়াচড়ায় সাহায্য করে।
৭. নিউরালজিয়া:
স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে তীব্র ব্যথা এবং জ্বালাপোড়ার অনুভূতি হতে পারে। শরীরের যেকোনো স্থানেই এই রোগ হতে পারে, বিশেষ করে সংক্রমণ এবং বয়সের কারণে।
৮. স্ট্রোক:
হৃদপিণ্ডে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ না হলে স্ট্রোক হয়, বিশেষ করে রক্তনালীতে ব্লকেজ হলে এমন হয়। স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ বাম হাত অবশ হওয়া, যা হাতের তালু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, কথা বলায় সমস্যা এবং হাত, মুখ ও পা অবশ হয়ে যেতে পারে।
৯. লাইম ডিজিজ:
এটি একটি পতঙ্গবাহিত ইনফ্লামেটরি ডিজিজ যা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রাথমিক লক্ষণ ক্লান্তি, জ্বর, পেশী ও জয়েন্টের ব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া। সময়মতো চিকিৎসা না করালে স্নায়ুর জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং হাত-পা অবশ হওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে।
১০. ফাইব্রোমায়ালজিয়া:
এটি মস্তিষ্কের এমন এক ধরনের সমস্যা, যার ফলে পেশীতে ব্যথা, স্মৃতির সমস্যা এবং মেজাজ পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা যায়। হাত এবং পা অবশ হয়ে যাওয়া এর একটি সাধারণ কারণ।
যদি আপনি ঘন ঘন হাত বা পায়ে অবশ ভাব অনুভব করেন, তবে এটিকে হালকাভাবে না নিয়ে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু করলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব।