নীরব ঘাতক গ্লুকোমা! অন্ধত্বের কারণ, নিয়মিত চোখ পরীক্ষায় মিলবে মুক্তি

আমাদের চোখের মাধ্যমেই আমরা এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে পাই। কিন্তু এক নীরব ঘাতক ধীরে ধীরে কেড়ে নিতে পারে সেই অমূল্য দৃষ্টিশক্তি—তার নাম গ্লুকোমা। সাধারণত চোখে তরল তৈরি হলে এবং চোখের ভেতরের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে এই রোগটি হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে গ্লুকোমা স্থায়ী অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ এই গ্লুকোমা। তবে দুঃখজনকভাবে বেশিরভাগ রোগীই রোগটি নির্ণয়ে অনেক দেরি করে ফেলেন। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে এর তেমন কোনো গুরুতর লক্ষণ দেখা যায় না, তাই রোগীও সহজে টের পান না। চোখের ভিজ্যুয়াল ফিল্ড (ভিএফ) যখন অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখনই সাধারণত গ্লুকোমা রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

আজ, ১৬ মে, বিশ্ব গ্লুকোমা দিবস না হলেও, প্রতি বছর ৬ থেকে ১২ মার্চ বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ পালিত হয়। বিশ্ব গ্লুকোমা অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে এই দিবসটি পালিত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো গ্লুকোমা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং প্রত্যেককে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করাতে উৎসাহিত করা।

গ্লুকোমা কেন হয়?

ভারতের গুরগাঁওয়ের ফোর্টিস মেমোরিয়াল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র কনসালটেন্ট গ্লুকোমা সার্জন ডা. শিবাল জানান, ‘গ্লুকোমার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো বংশগত। অর্থাৎ পরিবারে কারও এই রোগ থাকলে অন্যদেরও হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।’

এছাড়াও এই রোগের অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে চোখে আঘাত বা কোনো অস্ত্রোপচার। যারা নিয়মিত চশমা পরেন, তাদেরও গ্লুকোমা হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে। ডায়াবেটিস রোগী ও যাদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রেও গ্লুকোমা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ডা. শিবাল আরও জানান, স্টেরয়েড ব্যবহারের মাধ্যমেও গ্লুকোমা হতে পারে। তাই এর ব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত।

দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে গ্লুকোমা হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে চিকিৎসক জানান, ‘দীর্ঘ সময় স্ক্রিন টাইমের সঙ্গে সরাসরি গ্লুকোমা হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই। তবে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম চোখের শুষ্কতা, মাথাব্যথা এবং চোখের চাপের কারণ হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি চশমা বা অদূরদর্শীতা (মায়োপিয়া) হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।’

গ্লুকোমা কত প্রকার?

ডা. শিবাল গ্লুকোমাকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমটি হলো ওপেন-অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা, যা ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়। অন্যটি হলো তীব্র অ্যাঙ্গেল-ক্লোজার গ্লুকোমা, যা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতীয় ও দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে অ্যাঙ্গেল-ক্লোজার গ্লুকোমা হওয়ার ঝুঁকি বেশি এবং এটি অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণ।

তবে আশার কথা হলো, এই ধরনের গ্লুকোমার চিকিৎসা রয়েছে। নিরাময়মূলক লেজার চিকিৎসা গ্লুকোমার অগ্রগতি প্রতিরোধ করতে পারে। অন্যদিকে, ওপেন-অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমার রোগীদের সাধারণত আজীবন চিকিৎসার অধীনে থাকতে হয়।

গ্লুকোমা প্রতিরোধে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে স্টেরয়েডযুক্ত আই ড্রপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করুন, কারণ এই ধরনের ড্রপ চোখের স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নিয়মিত চোখ পরীক্ষার মাধ্যমেই গ্লুকোমাকে সহজে শনাক্ত করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের বছরে অন্তত একবার চক্ষু পরীক্ষা করানো উচিত। যদি পরিবারে গ্লুকোমার ইতিহাস থাকে, সেক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে এবং নিয়মিত চোখের ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। নীরব ঘাতক গ্লুকোমাকে পরাজিত করতে সচেতনতাই প্রধান হাতিয়ার।