দাম্পত্য কলহ ডেকে আনতে পারে কঠিন রোগ!

দাম্পত্য জীবনে সুখ-শান্তি সকলেরই কাম্য। তবে নানা কারণে সংসারে কলহের মেঘ জমতে পারে। ছোটখাটো মান-অভিমান সম্পর্কের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করলেও, দীর্ঘদিনের অশান্তি নারী-পুরুষ উভয়ের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। শুধু তাই নয়, এর প্রভাবে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে একাধিক জটিল রোগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাম্পত্য জীবনে তিক্ততা চরমে পৌঁছালে এবং সহ্যের সীমা অতিক্রম করলে কাউন্সেলিং জরুরি। তাতেও ফল না মিললে দ্রুত বিবাহবিচ্ছেদের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

সাইকোলজি টুডের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, একটি বিষাক্ত সম্পর্ক বিভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, মিথ্যা, পরনিন্দা এর অন্যতম কারণ। যারা এই ধরনের সম্পর্কে আবদ্ধ, তাদের শরীরে ধীরে ধীরে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে শুরু করে, যা একসময় মারাত্মক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আসুন জেনে নেওয়া যাক, একটি বিষাক্ত সম্পর্ক আপনার শরীরের কী কী ক্ষতি করতে পারে:

উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি: গবেষণা বলছে, চাপপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে। ২০১৬ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, দাম্পত্য কলহের জেরে পুরুষদের মধ্যে রক্তচাপ বৃদ্ধির প্রবণতা বেশি। নারীদের ক্ষেত্রেও এই ঝুঁকি থাকে, তবে তুলনামূলকভাবে কম।

দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস: একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের জন্ম দেয়। এই দীর্ঘমেয়াদী চাপ মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায় এবং থাইরয়েড ও মেজাজের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

শরীরে প্রদাহ বৃদ্ধি: বিষাক্ত সম্পর্কের কারণে শরীরে উচ্চ মাত্রার প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। মানসিক উত্তেজনা உடலில் প্রদাহের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে, যা সময়ের সাথে সাথে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার দিকে ধাবিত করে। ২০১৪ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্ট্রেস উল্লেখযোগ্যভাবে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে এবং প্রদাহ বৃদ্ধি করে।

বিষণ্নতার ঝুঁকি: একটি খারাপ সম্পর্কে আবদ্ধ থাকলে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। মেন্টাল হেলথ ফাউন্ডেশনের গবেষণা অনুযায়ী, একটি বিষাক্ত সম্পর্কে থাকার চেয়ে অবিবাহিত থাকা ভালো। সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হলে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (এমডিডি)-এর ঝুঁকি বাড়ে। দাম্পত্য কলহ বা বিচ্ছেদের কারণেও এই মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আয়ু কমে যাওয়া: অবাক করার মতো হলেও সত্যি, একটি বিষাক্ত সম্পর্ক আপনার জীবনকাল কমিয়ে দিতে পারে। সুখী দাম্পত্য জীবন যেমন আয়ু বৃদ্ধি করে, তেমনই একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে এবং আয়ু কমিয়ে আনে। মানসিক চাপ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক পরিবর্তন আনে, যা অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মাদকাসক্তি, ঘুমের অভাব এবং মানসিক চাপের মতো সমস্যা তৈরি করে, যা বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

ওজন বৃদ্ধি: সাইকোলজি টুডেতে প্রকাশিত এক সমীক্ষা অনুসারে, যারা ব্যক্তিগত জীবনে অসুখী অথবা দাম্পত্য কলহের মধ্যে দিন কাটান, তাদের ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা বেশি। এর ফলে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো স্থূলতা-সম্পর্কিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

হৃদরোগের ঝুঁকি: একটি বিষাক্ত সম্পর্ক হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে। মানসিক চাপ রক্তচাপ বৃদ্ধি করে, যা দীর্ঘমেয়াদী হৃদরোগের কারণ হতে পারে। গবেষণা বলছে, বিবাহিতদের তুলনায় অবিবাহিত ব্যক্তিদের হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিওভাস্কুলার সমস্যায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। তবে বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া নারী-পুরুষের মধ্যেও হৃদরোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।

অন্যান্য শারীরিক সমস্যা: যারা খারাপ সম্পর্কের মধ্যে থাকেন, তারা ঘন ঘন শরীরের ব্যথা, সর্দি, শ্বাসকষ্ট এবং প্যানিক অ্যাটাকের মতো সমস্যায় ভোগেন। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়, যার ফলে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। মানসিক চাপের কারণে মাথা ঘোরা, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, পেশিতে টান, ঘুমের সমস্যা, বুক ধড়পড় করা, ক্লান্তি, পেট খারাপ বা কাঁপুনিও দেখা দিতে পারে।

সুতরাং, দাম্পত্য জীবনে সুখী থাকা যেমন জরুরি, তেমনই একটি বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। কোনো সম্পর্কে তিক্ততা অনুভব করলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।