ঘাম স্বাভাবিক, কিন্তু দুর্গন্ধ কেন? জেনে নিন কারণ ও মুক্তির সহজ উপায়!

ঘাম হওয়া শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কারও বেশি ঘাম হয়, আবার কারও কম। তবে ঘামের কারণে সৃষ্ট দুর্গন্ধ অনেককেই ফেলে বিড়ম্বনায়। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, যে ঘামের কারণে এই বিরক্তিকর গন্ধ সৃষ্টি হয়, সেটি আসলে গন্ধহীন। তাহলে ঘামের কারণে গন্ধের উৎপত্তি হয় কীভাবে? এর পেছনের কারণ জানলে হয়তো কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন।
আমাদের ত্বকের নিচের বিশেষ গ্রন্থি থেকে তৈলাক্ত ক্ষরণের কারণেই মূলত এই গন্ধ অনুভূত হয়। এ ধরনের গ্রন্থি শরীরের বেশিরভাগ অংশে থাকলেও, বগলের নিচে এদের ঘনত্ব বেশি এবং এরা তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় থাকে।
শরীরের বেশিরভাগ অংশ আবৃত থাকে ‘ইক্রাইন’ নামক বিশেষ ঘাম গ্রন্থি দিয়ে। এছাড়াও আমাদের শরীরে আরও এক ধরনের ঘাম গ্রন্থি রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘অ্যাপোক্রাইন’ ঘাম গ্রন্থি। এই গ্রন্থিগুলো লোমযুক্ত স্থানে যেমন বগল এবং কুঁচকিতে বেশি দেখা যায়। অ্যাপোক্রাইন গ্রন্থি থেকে বের হয় তৈলাক্ত যৌগ। যখন আমরা কোনো কারণে মানসিক চাপ, ভয়, উদ্বেগ, ব্যথা অথবা যৌন উত্তেজনা অনুভব করি, তখন এই গ্রন্থিগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।
যে কারণে গন্ধ হয়:
ঘামের গ্রন্থি থেকে নির্গত তৈলাক্ত নিঃসরণে আদতে কোনো গন্ধ থাকে না। তবে এটি হলো আমাদের ত্বকে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়ার প্রধান খাদ্য। এই ব্যাকটেরিয়া আমাদের শরীর থেকে নির্গত ঘামকে ভেঙে ফ্যাটি অ্যাসিডে রূপান্তরিত করে এবং এর সঙ্গে মিশে যায় গন্ধের জন্য দায়ী বিভিন্ন যৌগ। আমাদের শরীরে সৃষ্ট এই গন্ধের জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করে জেনেটিক্স। এছাড়াও আমাদের অ্যাপোক্রাইন গ্রন্থিগুলো আমাদের চিন্তাভাবনা, আবেগ ও জীবনযাত্রার ধরনের ওপরও প্রতিক্রিয়া দেখায়, যা গন্ধকে প্রভাবিত করে। নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই বগলের লোম দুর্গন্ধ সৃষ্টিতে সাহায্য করে, কারণ এটি ব্যাকটেরিয়ার আঁতুঁড়ঘর হিসেবে কাজ করে। সাধারণত বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত অ্যাপোক্রাইন ঘাম গ্রন্থি সক্রিয় থাকে না, যে কারণে শিশুদের শরীরে ঘামের কারণে তেমন দুর্গন্ধ অনুভূত হয় না। তবে হরমোন উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে এই গন্ধ পরিবর্তিত হতে শুরু করে।
ঘামের গন্ধ থেকে মুক্তির উপায়:
ঘামের দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন কিছু নয়। কয়েকটি সহজ উপায় অবলম্বন করলেই এই বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়:
নিয়মিত গোসল: প্রতিদিন গোসল করলে ত্বক পরিষ্কার থাকে এবং ঘামের ব্যাকটেরিয়া ধুয়ে যায়, ফলে দুর্গন্ধ কমে। অ্যান্টিপারস্পাইরেন্ট গ্রন্থির মাধ্যমে নিঃসৃত ঘামের পরিমাণও এর ফলে হ্রাস পায়।
ডিওডোরেন্ট ব্যবহার: ঘামের দুর্গন্ধ দূর করতে ডিওডোরেন্ট একটি অত্যন্ত কার্যকর উপায়। এটি ত্বকের ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করে এবং দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী যৌগগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে।
সুতির পোশাক পরিধান: গরমকালে সুতির পোশাক পরলে তা শরীরের ঘাম শোষণ করে নেয় এবং বাতাস চলাচল করতে সাহায্য করে, ফলে ঘাম জমে দুর্গন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
পরিষ্কার পোশাক: প্রতিদিন পরিষ্কার পোশাক পরা জরুরি। ঘামে ভেজা বা অপরিষ্কার পোশাকে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়।
চাপমুক্ত থাকা: মানসিক চাপ ও উদ্বেগের কারণে অ্যাপোক্রাইন গ্রন্থি বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই যোগা, মেডিটেশন বা অন্যান্য আরামদায়ক কার্যকলাপের মাধ্যমে চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন।
ক্যাফেইন গ্রহণ কমানো: অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ ঘামের পরিমাণ বাড়াতে পারে। তাই চা ও কফির মতো পানীয়ের পরিমাণ কমালে ঘামের দুর্গন্ধও নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
এই সহজ উপায়গুলো মেনে চললে ঘামের কারণে হওয়া বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নিজের যত্ন নিন এবং থাকুন সতেজ!