আখরোট বনাম কাজুবাদাম: কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর? জানুন পুষ্টিবিদদের মতামত

আখরোট ও কাজুবাদাম—দুটিই পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় বাদাম। উভয় ধরনের বাদামেই প্রয়োজনীয় খনিজ, ভিটামিন এবং হৃৎপিণ্ডের জন্য উপকারী ফ্যাট রয়েছে। নানা ধরনের খাবার তৈরিতে এদের ব্যবহার যেমন ব্যাপক, তেমনি স্ন্যাকস হিসেবেও সরাসরি খাওয়া যায়। তবে পুষ্টিগুণের বিচারে কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, উভয় বাদামেরই নিজস্ব স্বতন্ত্র উপকারিতা রয়েছে এবং আপনার নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য লক্ষ্য অনুযায়ী এদের মধ্যে একটি বেছে নেওয়া উচিত।

পুষ্টিগুণের তুলনামূলক চিত্র (প্রায় ২৮ গ্রাম পরিমাপের জন্য):
ক্যালরি: আখরোটে প্রায় ১৮৫ ক্যালরি এবং কাজুবাদামে প্রায় ১৫৭ ক্যালরি থাকে।
ফ্যাট: আখরোটে ১৮.৫ গ্রাম ফ্যাট (যার মধ্যে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি থাকে), যেখানে কাজুবাদামে ১২.৪ গ্রাম ফ্যাট (যার বেশিরভাগই মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট) থাকে।
প্রোটিন: আখরোটে প্রায় ৪.৩ গ্রাম প্রোটিন থাকে, অন্যদিকে কাজুবাদামে ৫.২ গ্রাম প্রোটিন বিদ্যমান।
ফাইবার: আখরোটে ১.৯ গ্রাম ফাইবার থাকে, যেখানে কাজুবাদামে মাত্র ০.৯ গ্রাম ফাইবার পাওয়া যায়। (তবে আপনার দেওয়া তথ্যে আখরোটে ২ গ্রাম এবং কাজুবাদামে ৩ গ্রাম ফাইবার বলা হয়েছে, যা বর্তমান তথ্য অনুযায়ী কিছুটা ভিন্ন।)
কার্বোহাইড্রেট: আখরোটে ৩.৯ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট এবং কাজুবাদামে ৯.২ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে।
অন্যান্য: কাজুবাদামে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম ও জিঙ্ক তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, অন্যদিকে আখরোট অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের জন্য সুপরিচিত।
পুষ্টিবিদদের মতে, দুই ধরনের বাদামেই যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তবে কোন কারণে এটি খাচ্ছেন সেটার ওপর নির্ভর করেই বাদামের ধরন বাছাই করা উচিত।

আখরোট ও কাজুবাদামের বিশেষ উপকারিতা:
ওজন কমাতে চাইলে:
বাদামে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন ও ফাইবার থাকায় এটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, ফলে বারে বারে খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে। সব ধরনের বাদামই বিপাকক্রিয়া বাড়িয়ে ওজন হ্রাসে ভূমিকা রাখে।

কাজুবাদাম: ‘জার্নাল রিসার্চ ইন মেডিসিন সায়েন্সে’ প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, নিয়মিত কাজুবাদাম খান এমন ব্যক্তিরা যারা কাজুবাদাম খান না তাদের চেয়ে ৬৫ শতাংশ বেশি ওজন কমাতে পেরেছেন। অন্যান্য বেশ কয়েকটি গবেষণায়ও দেখা গেছে, কাজুবাদাম ওজন কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
আখরোট: আখরোট নিয়ে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ৩০ গ্রাম আখরোট খান, তারা দ্রুত ওজন কমাতে পারেন। যদিও আখরোট খেলে ওজন কমবে এমন গবেষণা কাজুবাদামের তুলনায় কম।
আলঝেইমার রোগীদের জন্য (মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য):
কাজুবাদাম, আখরোট এবং হ্যাজলনাটের মিশ্রণ আলঝেইমার রোগীদের জন্য উপকারী বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে।

কাজুবাদাম: ছয়টি গবেষণায় বলা হয়েছে, কাজুবাদাম মস্তিষ্ককে আরও ভালো কাজ করতে সহায়তা করে।
আখরোট: অন্যদিকে, ১৯টি গবেষণা বলছে, আখরোট মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে বেশি কার্যকর, বিশেষ করে এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের কোষের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
হৃদরোগের জন্য:
গবেষণায় দেখা গেছে, যে ব্যক্তিরা প্রতিদিন বাদাম খান তাদের হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি ৪০ শতাংশ কমে যায়। কাজুবাদাম এবং আখরোট দুটিই খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমায়, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রদাহ হ্রাস করে।

কাজুবাদাম: এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ই ও ম্যাগনেসিয়াম হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
আখরোট: পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান ও ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ ফ্যাটি অ্যাসিড হৃৎপিণ্ডের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ:

কাজুবাদাম: বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কাজুবাদামে থাকা ফ্যাট, প্রোটিন এবং ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা উন্নত করতে সহায়তা করে। কাজুবাদাম খাবারের গ্লাইসেমিক সূচক (GI) কমাতে সাহায্য করে, যে কারণে এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী।
আখরোট: আখরোটে প্রচুর পরিমাণে চর্বি, প্রোটিন এবং ফাইবার রয়েছে। তবে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে কতটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে, সে বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। যদিও কিছু গবেষণা বলছে, আখরোট ফাস্টিং ইনসুলিনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
সংক্ষেপে, আখরোট মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য এবং প্রদাহ কমানোর ক্ষেত্রে এগিয়ে, কারণ এতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি। অন্যদিকে, কাজুবাদাম প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর হতে পারে। আপনার সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য লক্ষ্য অনুযায়ী এই দুটি বাদামই পরিমিত পরিমাণে খাদ্যতালিকায় যোগ করে উপকার পেতে পারেন।