আপনার কি বাসন মেজে, কাপড় কেচে হাত রুক্ষ হয়ে গেছে? আর কি হাতের সেই জৌলুস নেই? হবে নাই বা কেন, যা দিনকাল পড়েছে, বাড়িতে কাজের মাসি রাখাও এখন বিরাট খরচের ব্যাপার। তাই বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের অধিকাংশ মহিলাকেই সব কাজ নিজে হাতে করতে হয়। সেই জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ! ফলত, নরম-কোমল-মখমলে হাত স্কচব্রাইটের মতোই রুক্ষশুষ্ক চেহারা নেয়। আঙুলের গাঁট কালচে হয়ে যায়। হাতের তালু খড়খড় করে। আর নখ ভেঙে যায় বারংবার। এমন হাতে নেইলপলিশ পরলে বা আংটি পরলে, খুব খারাপ দেখতে লাগে।
এর কারণ, হাতের ত্বকের উপরি স্তর ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ডিটার্জেন্ট ও ডিশসোপ ব্যবহারের জন্য। আরও অনেক কারণে হাত দেখতে খারাপ হয়ে যায়।
শুকনো হাওয়া – অনেকের ত্বক শুষ্ক। তাই হাতের ত্বকেও শুষ্কতা প্রকট হয়ে ওঠে। অনেকের আবার শীতকালে বা রুক্ষ জায়গায় বেড়াতে গেলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। বাতাসে রুক্ষতা থাকলেও হাত রুক্ষ হয়ে যায় অনেকের।
জল – অতিরিক্ত জল ঘাঁটলে, বাসন মাজলে, কাপড় কাচলে, ঘর মুছলে কিংবা বারবার হাত ধুলে হাতের ত্বকে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। জলের কারণে হাতের ওই অংশ থেকে তেল বেরিয়ে আসে। ভাঁজ পড়ে, রুক্ষ হয়ে যায়, দেখতে খুব খারাপ লাগে।
কেমিক্যালস্ – কড়া কেমিক্যাল আছে এমন সাবান, ডিটারজেন্ট, ক্লিনজ়ার ব্যবহার করলে তা হাতের ত্বক রুক্ষ করে দেয় সহজেই। তাই অতিরিক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
কী কী করলে হাতের রুক্ষতা দূর হবে -কয়েকটি মৌলিক বিষয় মেনে চললে হাতের রুক্ষতা দূর হতে পারে অল্পদিনের মধ্যেই। খুব সহজেই হাতের ত্বক ফিরে পেতে পারে হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য। সেগুলি কী কী জেনে নিন –
১]সাবানের ব্যবহার ত্যাগ করুন – সিন্থেটিক সুগন্ধি, প্রেজ়ারভেটিভ, সালফেটস্ আছে এমন সাবান এড়িয়ে চলুন। এই রাসায়নিক উপাদানগুলি হাতের ত্বক রুক্ষ করে দিতে পারে খুব। অতিরিক্ত ফেনা হয় বা অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল সাবান এড়িয়ে চলুন। এগুলি হাতের ত্বক থেকে প্রাকৃতিক ফ্যাট ও তেল বের করে দেয়, ত্বকের রুক্ষতা বাড়ায়। হার্বাল সাবান ব্যবহার করুন, যাতে কেমিক্যালের প্রভাব খুব কম। হাত ধোয়ার পর জল দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে ভুলবেন না। মনে রাখবেন, হাতে সাবান লেগে থাকলে তা ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
২]ময়েশ্চারাইজ়ারের ব্যবহার – হাত সাবান দিয়ে ধোয়ার পর তা রুক্ষ হয়ে যায়। তাই তৎক্ষণাৎ ময়েশ্চারাইজ়ার লাগান দু’হাতে। ব্যাগের মধ্যে ময়েশ্চারাইজ়ার রাখুন সবসময়। কোকোনাট বডি অয়েল, মাইল্ড বেবি লোশন বা অলিভ অয়েল রাখতে পারেন। হাত পরিষ্কার করার সঙ্গে সঙ্গে তেল বা লোশন দিয়ে ভালো করে হাত ময়েশ্চারাইজ় করে নিন।
৩]হ্যান্ড স্যানিটাইজ়ার ব্যবহার করে তেল লাগান – হাতকে জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজ়ারের একটা ছোটো টিউব সবসময় ব্যাগের ভিতর রেখে দেয় অনেকে। বাইরে খাওয়াদাওয়া করতে হলে তালুতে একফোঁটা হ্যান্ড স্যানিটাইজ়ার দিলে, তা ব্যাক্টেরিয়া ফ্রি হয়ে যায়। কিন্তু তাতে হাতের বারোটা বাজে। রুক্ষ হয়ে যায়। এরজন্য হাতে স্যানিটাইজ়ার দিলে অবশ্যই ময়েশ্চারাইজ়ার, তেল কিংবা লোশন লাগিয়ে নিন।
৪]গরম হাওয়া লাগাবেন না হাতে – হাত শুকানোর করার জন্য রেস্টরুমে বা বাথরুমে হ্যান্ড ড্রায়ার রাখেন অনেকে। ধোয়ার পর হাতের তালু সেই ড্রায়ারের তলায় ধরতে হয়। টিশু বা রুমালের দরকার হয় না। হাত শুকিয়ে যায়। এভাবে অনেকেই হাত শুকোয়। কিন্তু এতে হাতের রুক্ষতা বাড়ে।
৫]গ্লাভস্ পরুন – অনেকেই শখ করে বাজার থেকে বড় বড় গ্লাভস্ কিনে আনেন, কিন্তু সেই গ্লাভস্ ঘরের তাকেই পরে থাকে। কাপড় কাচা, বাসন মাজা ও ঘর মোছার কাজ চলে গ্লাভস্ বিহীন হাতেই। জল থেকে হাতকে বাঁচাতে হলে সবার আগে তাক থেকে নামিয়ে নিন গ্লাভস্, দু’হাতে পরুন, শুরু করুন ঘরের যাবতীয় কাজ। হাতের ত্বক থেকে আঙুলের নখ, সব অক্ষত থাকবে।
হাতের রুক্ষতা দূর করার ঘরোয়া উপায় -রান্নাঘরে উপস্থিত কিছু প্রাকৃতিক উপাদানের সাহায্যে হাতের সৌন্দর্য ফিরে পেতে পারেন আপনি। এতে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।
১]হ্যান্ড প্যাক – যেমন মুখের জন্য আপনি ফেসপ্যাক ব্যবহার করেন, ঠিক তেমনই হাতের রুক্ষতা মেটানোর জন্য হ্যান্ড প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। এর জন্য আপনাকে পিলিং মাস্ক তৈরি করতে হবে। একটি পাত্রে কয়েকফোঁটা লেবুর রস, কয়েকফোঁটা মধু ও এক চামচ নুন ভালোভাবে মেশান। তারপর হাতে মাখুন। হাত হবে নরম-কোমল-মখমলে।
২]এক্সফোলিয়েশন – লেবুর রস ও চিনির সাহায্য এক্সফোলিয়েট করতে পারেন হাত। সব ময়লা বেরিয়ে যাবে। এর জন্য এক বাটি পাতিলেবুর রসের সঙ্গে মোটা দানার চিনি মেশান। তারপর সেই মিশ্রণটি দু’হাতে ভালো করে ঘষুন। ধীরে ধীরে চিনির দানাগুলি গলে যাবে। হাতের ত্বকের সমস্ত মরাকোশ দূর হবে। নতুন কোশ তৈরিতে সাহায্য করবে ধীরে ধীরে। এই প্রণালীতে এক্সফোলিয়েট করলে হাত পরিষ্কার হবে দ্রুত, আগের চেয়ে ফরসা হবে দ্বিগুণ।
৩]ম্যাসাজ – বাড়িতে মাখন থাকলে তা ময়েশ্চারাইজ়ারের কাজ করতে পারে। এককাপ গলে যাওয়া মাখন আমন্ড অয়েল মেশান। হাতে ম্যাসাজ করে নিন। নিয়মিত ম্যাসাজ করলে ধীরে ধীরে কোমল হবে হাত।
৪]কোকোবাটার – বাসন মাজা, কাপড় কাচা ও ঘর মোছার আগে কিছু প্রস্তুতি নিলে হাতে ক্ষতি কম হতে পারে। এরজন্য হাতে কোকোবাটার মেখে নিন আগে। তারপর গ্লাভস্ পরুন। গ্লাভস্ না পরলেও চলবে। হাতে কোকোবাটার লাগানো থাকলে, তা জলের সংস্পর্শে এলে আরও নরম হতে পারে।
৫]গ্লিসারিন – অনেকের ড্রেসিংটেবিলেই গ্লিসারিনের কৌটো দেখতে পাওয়া যায়। কোনও কাজে লাগে না। এরা সেটিকে কাজে লাগাতে পারেন। পাতিলেবুর রসে গ্লিসারিন মিশিয়ে হাতে লাগালে কার্যকরী ফল পেতে পারেন। মিশ্রণটি অল্প পরিমাণে হাতের তালুতে নিয়ে ভালো করে মাখুন। যতক্ষণ না ত্বকের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে মাখতে থাকুন। এরপর একইভাবে মিশ্রণটি কনুইতে মাখুন।
৬]নখের যত্নে – অনেকসময় জল ঘাঁটার কারণে নখ পলকা হয়ে যেতে পারে। ফলত, সামান্য বড় হলেই মট করে ভেঙে যেতে পারে। এটি অনেক মহিলাকেই যন্ত্রণা দিতে পারে। মখ মজবুত হয় যদি হাড় শক্ত থাকে। এর জন্য খাদ্যাতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালশিয়াম থাকা মাস্ট। নিয়মিত আটা বা ময়দা মাখুন। নখ শক্ত হবে। নেইল ফাইলিং করলে পাশ থেকে নখ ভেঙে যাবে না।