শুধু কিডনি নয়, শরীরের এই ৯ স্থানেও জমতে পারে পাথর! জানুন লক্ষণ ও প্রতিকার

শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাথর জমার সমস্যায় অনেকেই ভুগে থাকেন। বিশেষ করে কিডনি, গলব্লাডার, মূত্রাশয় কিংবা প্রোস্টেটে পাথর জমার কথা কমবেশি সকলেরই জানা। তবে শরীরের আরও কিছু অংশে পাথর জমতে পারে, যা হয়তো অনেকেরই অজানা। শরীরের কোন কোন স্থানে পাথর জমতে পারে এবং তার লক্ষণগুলো কী, সে সম্পর্কে অবগত থাকলে দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়া সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক শরীরের সেই ৯টি স্থান সম্পর্কে যেখানে পাথর জমার প্রবণতা বেশি:

১. কিডনি: কিডনিতে পাথর জমার সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ক্যালসিয়াম, অক্সালেটসহ বিভিন্ন খনিজের মাধ্যমে মূত্রনালিতে এই পাথর জমে। এর ফলে নিতম্ব ও পাঁজরের কাছে এবং পিঠে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। পাথর প্রস্রাবের রাস্তা আটকে দেওয়ার মতো বড়ও হতে পারে। প্রস্রাবে রক্ত বা পাথরের ছোট টুকরো দেখা গেলে দ্রুত সতর্ক হওয়া উচিত। ছোট পাথর সাধারণত প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে গেলেও, বড় পাথরের জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

২. গলা (টনসিল): ছোট-বড় অনেকেই টনসিলের সমস্যায় ভোগেন। টনসিল হলো গলার পেছনের টিস্যুর দুটি পিণ্ড, যা জীবাণু ফিল্টার করতে সাহায্য করে। খাদ্য, মৃত চামড়া বা অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ এখানে জমা হয়ে শক্ত পাথরের মতো রূপ নিতে পারে, যাকে ‘টনসিলোলিথ’ বলা হয়। এর লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে গলাব্যথা, দুর্গন্ধযুক্ত শ্বাস এবং গলার ভেতরে সাদা দাগ দেখা দেওয়া। গিলেতে গেলে গলায় ব্যথাও অনুভূত হতে পারে। টুথব্রাশ বা তুলো দিয়ে আলতো করে এই পাথর বের করা যায়। এছাড়া লবণ জল দিয়ে গার্গলও করা যেতে পারে। সমস্যা না কমলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৩. মূত্রাশয়: দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখা এবং সময়মতো প্রস্রাব না করার কারণে মূত্রাশয়ে পাথর জমতে পারে। এই পাথর সরাসরি মূত্রাশয়ে তৈরি হতে পারে, আবার ছোট পাথর কিডনি থেকে মূত্রাশয়ে নেমে আসার পর বড় হতে পারে। এর লক্ষণগুলির মধ্যে মেঘলা বা রক্তাক্ত প্রস্রাব অন্যতম। প্রস্রাব করার সময় তলপেটে ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এটি ওষুধ, সার্জারি অথবা শব্দ তরঙ্গ বা লেজারের মাধ্যমে ভেঙেও চিকিৎসা করা যায়।

৪. গলব্লাডার: পেটের উপরের ডান দিকে অবস্থিত এই ছোট অঙ্গটি পিত্ত নামক পাচক রস সঞ্চয় করে। কোলেস্টেরল এবং পিত্তে বিলিরুবিন নামক একটি যৌগ পিত্তথলিতে পাথরের কারণ হতে পারে। এর প্রধান লক্ষণ হলো পেটে তীব্র ব্যথা। পাথরের কারণে ব্যথা হলে পিত্তথলি কেটে বাদ দেওয়ার জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

৫. প্রোস্টেট: পুরুষদের মূত্রাশয়ের কাছে অবস্থিত একটি ছোট গ্রন্থি শুক্রাণু রক্ষার জন্য তরল তৈরি করে। এখানে যে পাথরগুলো তৈরি হয়, সেগুলো প্রায় পপি বীজের আকারের হয়ে থাকে এবং সাধারণত মধ্যবয়সী বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে দেখা যায়। প্রথমদিকে প্রোস্টেটের পাথরের তেমন উপসর্গ না থাকলেও, কখনো কখনো এটি সংক্রমণের কারণ হতে পারে। ফলে প্রোস্টেটে যন্ত্রণা বাড়ে ও মূত্রনালির সমস্যা দেখা দেয়। এর জন্য অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

৬. মুখ (লালা গ্রন্থি): অনেকেই হয়তো জানেন না, মুখের ভেতরেও পাথর হতে পারে। এর ফলে মুখের ভেতরে তীব্র ব্যথা হয় এবং খাবার খেতেও কষ্ট হতে পারে। এই পাথরের কারণে লালা চ্যানেলের টিউবগুলো বন্ধ হয়ে যায়। জিহ্বার নীচে সাদা পাথর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এটি সাধারণত গুরুতর নয় এবং বেশি করে জল পান করলে বা টক কিছু খেলে এই পাথর বেরিয়ে আসতে পারে।

৭. অগ্ন্যাশয়: পেটের মাঝখানের এই অঙ্গটি হরমোন তৈরি করে, যা খাবার হজম করতে ও রক্তে শর্করাকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। পাথর গলব্লাডার থেকে পিত্তনালির মাধ্যমে অগ্ন্যাশয়ে যেতে পারে এবং সেখানে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এর লক্ষণগুলির মধ্যে জ্বর, দ্রুত হৃদস্পন্দন, বমি বমি ভাব এবং পেটে ব্যথা অন্যতম। খাওয়ার পর লক্ষণ আরও তীব্র হতে পারে এবং ব্যথা পিঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাথর নিজে থেকে না গেলে পরীক্ষার মাধ্যমে ডাক্তার এটি বের করার জন্য অস্ত্রোপচার করতে পারেন।

৮. নাক: নাকের ভেতরে পাথর জমার ঘটনা বিরল হলেও, ছোটবেলায় নাকে শক্ত কিছু আটকে যাওয়ার কারণে পরবর্তী সময়ে এমনটি ঘটতে পারে। বছরের পর বছর ধরে ওই পদার্থ ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও লোহার মতো খনিজকে আকর্ষণ করে এবং তা বড় হতে থাকে। এর কারণে নাকে ব্যথা বা দুর্গন্ধযুক্ত শ্লেষ্মার লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা শুধু নাসারন্ধ্র থেকে নিষ্কাশিত হয়। ডাক্তার একটি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে নাক পরীক্ষা করার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন।

৯. শিরা: শিরা যখন স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় না, তখন দুর্বল দাগ, বাম্প ও অন্যান্য সমস্যার কারণ হতে পারে। ত্বকে ব্যথা ও বিবর্ণতা দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে মুখ, ঠোঁট, গাল, মাথা ও ঘাড়ের চারপাশে। শিরায় পাথর হলে রক্ত সেই জায়গাগুলোতে ধীরে ধীরে চলে, অবশেষে জমাট বাঁধে ও শক্ত হয়ে পাথরে পরিণত হয়। উপসর্গ বুঝে চিকিৎসক চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।

১০. পেট (ডাইভার্টিকুলা): ডাইভার্টিকুলাইটিস বা প্রদাহজনক অন্ত্রের রোগের মতো অসুস্থতার কারণে পেটেও পাথর হতে পারে। বংশে কারও এই সমস্যা থাকলে বা পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচারের কারণে আপনার পেট ও অন্ত্রে পরিবর্তনের ফলেও পাথর জমতে পারে। অপারেশনের মাধ্যমেই এই পাথর বের করা হয়।

শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাথর জমার লক্ষণ সম্পর্কে অবগত থাকলে এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব। তাই অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন।