পুরুষের স্তন ক্যানসার, নীরব ঘাতক, সচেতনতাই বাঁচার পথ!

স্তন ক্যানসার সচেতনতার প্রতীক হিসেবে যদিও ‘গোলাপী রিবন’ বহুল প্রচলিত, তবে এই ধারণাটি অনেককেই ভুল পথে চালিত করতে পারে। স্তন ক্যানসার কেবল নারীদের রোগ নয়, পুরুষদেরও স্তন ক্যানসার হতে পারে এবং এর পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। মাউন্ট সিনাই বেথ ইসরায়েলের ব্রেস্ট সার্জারির প্রধান সুসান কে. বুলবল জোর দিয়ে বলেছেন, “সাধারণ প্রশ্ন হচ্ছে: পুরুষের যদি স্তন না থাকে, তাহলে তাদের কিভাবে স্তন ক্যানসার হতে পারে? আমি বলবো, অবশ্যই তাদের স্তন ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা আছে।” পুরুষেরা অল্প পরিমাণ স্তন টিস্যু নিয়ে জন্ম নেয় এবং নারীদের মতো স্তনের বৃদ্ধি না হলেও সেখানে ক্যানসার বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির মতে, পুরুষের মধ্যে স্তন ক্যানসার নারীদের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ কম হলেও, এটি প্রাণঘাতী হতে পারে যদি দেরিতে শনাক্ত হয়।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, পুরুষের স্তন ক্যানসার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য:
১. স্তনে পিণ্ড হওয়া: প্রথম ও প্রধান উপসর্গ
ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টারের ব্রেস্ট মেডিক্যাল অনকোলজির প্রফেসর শ্যারন হার্মিস জিওর্দানো জানান, “আপনার বুকের স্তনে পিণ্ড বা ডেলা বা দলা অনুভব করা – এটিই অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষের স্তন ক্যানসারের প্রথম উপসর্গ।” বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, এই পিণ্ড সরাসরি নিপলের পেছনে পাওয়া যায়, তবে এটি স্তনের যেকোনো স্থানে হতে পারে। ডা. বুলবল আরও যোগ করেন যে, বগলে বর্ধিত লসিকাগ্রন্থিও অনুভব করা যেতে পারে। নিপলের পরিবর্তন, যেমন আকৃতি পরিবর্তন হওয়া বা ভেতরে ঢুকে যাওয়া, এবং স্তন থেকে রক্তপাত হওয়াও উদ্বেগজনক উপসর্গ।
২. পারিবারিক ইতিহাস: একটি বড় ঝুঁকির কারণ
স্তন ক্যানসারের পারিবারিক ইতিহাস, অর্থাৎ পরিবারে কোনো নারী বা পুরুষের অতীতে স্তন ক্যানসার হয়ে থাকলে, তা পুরুষদের জন্য একটি বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, পুরুষ স্তন ক্যানসার রোগীদের প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের স্তন ক্যানসার ছিল।
অনেক ক্ষেত্রে, BRCA1 বা BRCA2 জিনের মিউটেশন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার কারণে স্তন ক্যানসার হয়। BRCA2 জিন মিউটেশন থাকলে পুরুষদের জীবনকালে ক্যানসার বিকাশের ঝুঁকি ১০০ জনের মধ্যে ৬ জনে দাঁড়াতে পারে, আর BRCA1 মিউটেশন থাকলে ঝুঁকি ১০০ জনের মধ্যে ১ জন। এই জিন মিউটেশনগুলো প্রোস্টেট ক্যানসার, মূত্রথলি ক্যানসার এবং অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
ডা. জিওর্দানো পরামর্শ দেন, যদি আপনার কোনো রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের মধ্যে BRCA জিন মিউটেশন থাকে (যা পিতামাতার মাধ্যমে সন্তানের মধ্যে প্রেরিত হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ) অথবা যদি আপনার স্তন ক্যানসারের জোরালো পারিবারিক ইতিহাস থাকে, তাহলে জেনেটিক টেস্ট করানো একটি স্মার্ট পদক্ষেপ হতে পারে, যা আপনাকে যেকোনো সম্ভাব্য ক্যানসার নির্দেশক স্তন পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করবে।
৩. কিছু শারীরিক অবস্থা পুরুষের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়
ডা. বুলবল বলেন, পারিবারিক ইতিহাস বড় উদ্বেগের বিষয় হলেও, কিছু শারীরিক অবস্থাও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যেমন – ইস্ট্রোজেন বৃদ্ধি। ডা. জিওর্দানো উল্লেখ করেন, পুরুষ স্তন ক্যানসার রোগীদের মধ্যে হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত (বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন) টিউমার হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে, যা নারীদের মধ্যে হওয়া কিছু স্তন ক্যানসারের বিপরীত।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির মতে, যদিও পুরুষের স্তন ক্যানসারের অধিকাংশ কারণ অজ্ঞাত, ধারণা করা হয় যে, হরমোনের মাত্রা এই ক্যানসার বিকাশে ভূমিকা রাখে। ইস্ট্রোজেনের মতো নারী হরমোনের প্রতিক্রিয়ায় স্তন কোষ বৃদ্ধি পায় ও বিভাজিত হয়। যত বেশি বিভাজিত হওয়ার ঘটনা ঘটবে, ডিএনএ কপি প্রক্রিয়ায় তত বেশি গোলমাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যার ফলে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ও বিস্তার বেড়ে যেতে পারে।
ইস্ট্রোজেন সম্পর্কিত একটি ঝুঁকির বিষয় হচ্ছে যকৃত রোগ (যেমন – সিরোসিস বা সিভিয়ার লিভার স্কারিং, যা দীর্ঘদিনের মদ্যপান থেকে হতে পারে)। তীব্র মাত্রার যকৃত রোগে ভোগা পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত টেসটোস্টেরনের মতো পুরুষ হরমোন কম থাকে এবং ইস্ট্রোজেন বেশি থাকে। স্থূলতাও পুরুষ ও নারী উভয়কেই উচ্চ ঝুঁকিতে রাখে, কারণ চর্বি কোষ অ্যান্ড্রোজেনকে ইস্ট্রোজেনে রূপান্তর করে। এছাড়াও, লিম্ফোমার মতো ক্যানসারের চিকিৎসা করতে যেসব পুরুষের বুকে রেডিয়েশন চিকিৎসা সম্পাদিত হয়েছে, তারাও উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।
৪. স্তন পিণ্ড নির্ণয়ে বিভ্রান্তি: গাইনিকোম্যাস্টিয়া
পুরুষের স্তনে পিণ্ড অনুভূত হলে প্রায়শই তা নির্ণয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে, যা উচ্চমাত্রার ইস্ট্রোজেনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই অবস্থাকে গাইনিকোম্যাস্টিয়া বলে, যা সাধারণত পুরুষের স্তনের টিস্যু বৃদ্ধির কারণে হয়ে থাকে। ডা. বুলবল বলেন, “পুরুষরা ব্রেস্ট সার্জনের কাছে যাওয়ার সবচেয়ে কমন কারণগুলোর একটি হচ্ছে, পুরুষের স্তনে পিণ্ড তৈরি হয়েছে। এটি প্রায়ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসারের পরিবর্তে গাইনিকোম্যাস্টিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।”
ডা. বুলবলের মতে, গাইনিকোম্যাস্টিয়া নিজে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় না, কিন্তু যেহেতু এটির সঙ্গে উচ্চমাত্রার ইস্ট্রোজেন সম্পর্কিত, সেহেতু নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন যে এটি কেবলমাত্র গাইনিকোম্যাস্টিয়া। যদি এটি স্তন পিণ্ড না হয়ে থাকে, একজন ফিজিশিয়ান নির্ধারণ করতে পারেন এটি কেন হচ্ছে।
৫. পুরুষের স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা রয়েছে
পুরুষ ও নারীর স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় বেশ মিল রয়েছে, যদিও প্রত্যেক রোগীর অবস্থা ভিন্ন। ডা. বুলবল বলেন, “যখন একজন পুরুষ স্তন পিণ্ড বা ডেলা নিয়ে আমাদের কাছে আসে, আমরা প্রায়ক্ষেত্রে নারীদের জন্য যা করি তার জন্যও তা করি – যেমন, ম্যামোগ্রাম ও আল্ট্রাসাউন্ড নিয়ে থাকি।” এটি ডাক্তারকে বুঝতে সাহায্য করে যে ক্যানসার কোষ পরীক্ষার জন্য বায়োপসি লাগবে কিনা।
যদি স্তন ক্যানসার নির্ণীত হয়, তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ সাধারণত সার্জারি। ডা. জিওর্দানো বলেন, “অধিকাংশ পুরুষকে মাস্টেক্টমি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, এমনকি তাদের খুব ক্ষুদ্র স্তন টিস্যু থাকলেও।” এরপর সার্জন বগলের লসিকাগ্রন্থির বায়োপসি করবেন যাতে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন যে ক্যানসার বিস্তার লাভ করেনি। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশন প্রদান করা হয়।
৬. ডায়াগনোসিস বিলম্ব হলে মারাত্মক হতে পারে
একই পর্যায়ে পুরুষ ও নারীর স্তন ক্যানসার নির্ণীত হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আরোগ্য লাভের হার একই। ডা. বুলবল বলেন, “তারা উভয়েই যদি প্রথম পর্যায়ে অবস্থান করে, তবে তাদের সামগ্রিক আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা একই।”
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক পুরুষ স্তন ক্যানসার নির্ণয়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন। এর কারণ, ডা. জিওর্দানো বলেন, “স্তন পিণ্ড অনুভব করার পরও অনেক পুরুষ ভাবে না যে এটি ক্যানসার হতে পারে, তাই তারা ডাক্তারের কাছে যায় না।” ফলে তারা প্রায়শই বড় টিউমার নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন, যা লসিকাগ্রন্থি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সময়মতো শনাক্ত করতে পারলে এটিকে দমন করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তাই পুরুষদের ক্ষেত্রেও স্তনে যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা পিণ্ড অনুভূত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতাই জীবন বাঁচাতে পারে।