নীরব ঘাতক ওভারিয়ান ক্যানসার! প্রাথমিক লক্ষণ চিনতে পারলে বাঁচানো সম্ভব জীবন

নারীদের মধ্যে যে কয়েকটি ক্যানসার বেশি দেখা যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো ওভারিয়ান ক্যানসার বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসার। একে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়, কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে এর লক্ষণগুলো তেমন স্পষ্ট হয় না। তবে, এই ক্যানসার অস্বাভাবিক বা বিরল কোনো রোগ নয় এবং প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেলে দ্রুত প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ওভারি বা ডিম্বাশয় কী?
ওভারি বা ডিম্বাশয় নারী শরীরে সন্তান ধারণের জন্য অপরিহার্য ডিম্বাণু তৈরি করে। এর পাশাপাশি, এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত জরুরি দুটি হরমোন—ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন—উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিটি নারীর জরায়ু অর্থাৎ ইউটেরাসের দু’পাশে দুটি করে ওভারি অবস্থিত।
ওভারির যেকোনো অসুস্থতা নারীর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে ওভারিয়ান ক্যানসার মারাত্মক হতে পারে এবং মৃত্যুর কারণও बनতে পারে। ডিম্বাশয়ের ক্যানসার শরীরে মূলত চারটি ধাপে ছড়িয়ে পড়ে: প্রথম ধাপে এটি একটি বা উভয় ওভারিতে সীমাবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয় ধাপে ওভারি থেকে তলপেটের কাছাকাছি ছড়িয়ে পড়ে। তৃতীয় ধাপে পুরো পেটে ছড়িয়ে যায় এবং সর্বশেষ ধাপে এটি শরীরের অন্যান্য অংশেও বিস্তার লাভ করে।
ওভারিয়ান ক্যানসারের লক্ষণ:
এই ক্যানসারের একটি বড় সমস্যা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে এটি সহজে শনাক্ত করা যায় না। অধিকাংশ রোগীই বুঝতে পারেন না যে তারা এই রোগে ভুগছেন। পেলভিক জোন ও পেটে না ছড়ানো পর্যন্ত এটি তেমন কোনো সুস্পষ্ট উপসর্গ দেখায় না। ডিম্বাশয় ক্যানসারের প্রাথমিক উপসর্গগুলো খুবই সূক্ষ্ম হতে পারে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায় ব্যথাহীন থাকে। এই কারণেই রোগ শনাক্তে প্রায়শই দেরি হয়ে যায়।
ওভারিয়ান ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো:
১. ক্ষুধামান্দ্য ও পেট ভরা ভাব: ডিম্বাশয়ে ক্যানসার হলে খাদ্য হজম প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে ক্ষুধা কমে যায় এবং সব সময় পেট ভরা ভরা অনুভূত হয়। হঠাৎ করে ক্ষুধা কমে যাওয়া এই রোগের একটি প্রধান লক্ষণ হতে পারে।
২. কোমরের নিচের দিকে চিনচিনে ব্যথা: দীর্ঘদিন ধরে কোমরের নিচের দিকে হালকা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলে তা ডিম্বাশয় ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
৩. অনিয়মিত মাসিক ও যোনিপথে রক্তপাত: ওভারিয়ান ক্যানসারের অন্যতম লক্ষণ হলো অনিয়মিত মাসিক। এছাড়াও, যোনিপথে হঠাৎ করে রক্তপাত হওয়াও ভালো লক্ষণ নয়। তবে অনেক সময় ডিম্বাশয়ের সিস্টের কারণেও অনিয়মিত পিরিয়ড হতে পারে।
৪. কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া: এক্ষেত্রে প্রায়ই কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডিম্বাশয়ের টিউমার ফুলে উঠে পেট, অন্ত্র, ব্ল্যাডার বা মূত্রথলিতে চাপ দিলে এই সমস্যাগুলো হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যায় ভুগলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৫. অন্যান্য লক্ষণ: হঠাৎ করে ওজন কমতে শুরু করা, ঘন ঘন প্রস্রাব লাগা, পেলভিস এরিয়ায় ঘন ঘন ব্যথা, যোনি পথের আশপাশের চামড়ার রং পরিবর্তন বা ফুসকুড়ি দেখা দেওয়াও ওভারিয়ান ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
৬. আরও কিছু লক্ষণ: সাদা স্রাব নিঃসরণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র পেট ব্যথাও ওভারিয়ান ক্যানসারের ইঙ্গিত দিতে পারে।
ওভারিয়ান ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে কেন?
কিছু কারণ ওভারিয়ান ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অনিয়মিত মাসিক, দীর্ঘ সময় ধরে গর্ভনিরোধক ওষুধ সেবন, একাধিকবার গর্ভধারণ এবং অল্প বয়সে গর্ভাবস্থা। এছাড়াও, কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহারেও ডিম্বাশয়ে টিউমার হতে পারে। যাদের প্রজনন অক্ষমতার জন্য হরমোনাল চিকিৎসা নিতে হয়, তাদেরও ডিম্বাশয় ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে। মেনোপজের আগে শরীরের অতিরিক্ত ওজনও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। পাশাপাশি, পরিবারের কারও যদি আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকে, তাহলে অন্যদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
ওভারিয়ান ক্যানসার প্রাথমিকভাবে ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিৎসা করা হলে পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে রোগীর ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। এই ক্যানসার শনাক্ত করার জন্য রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানিং, ল্যাপারোস্কপি, সিরাম টিউমার মার্কার টেস্ট ও ইমিউনোলজিক্যাল টেস্টের মতো বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
ওভারিয়ান ক্যানসারের চিকিৎসা ও প্রতিকার:
প্রাথমিক কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ওভারিয়ান ক্যানসার ধরা পড়লে কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন কতটা কার্যকর হবে, তা অনকোলজিস্ট নির্ধারণ করতে পারবেন। যাদের শরীরে ওভারিয়ান ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি, তারা ঝুঁকি কমাতে ওভারি ও ফ্যালোপিয়ান টিউব অপসারণ করার বিষয়েও বিবেচনা করতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারী সন্তানকে বুকের দুধ দেন, তাদের মধ্যে ওভারিয়ান ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। ওভারিয়ান ক্যানসারে আক্রান্ত হলে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে সঠিক চিকিৎসা নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।