কথায় কথায় অতিরিক্ত রাগ ও চিৎকার করার অভ্যাস? কোন মারাত্মক রোগ ডেকে আনছেন জানেন কি?

প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনযাত্রা, কাজের চাপ এবং মানসিক অবসাদের কারণে আধুনিক সমাজে মানুষের ধৈর্য্য যেন ক্রমশ কমে আসছে। সামান্য কারণে মেজাজ হারিয়ে ফেলা, অতিরিক্ত রাগ করা এবং চেঁচামেচি করার মতো ঘটনা এখন ঘরে ঘরে অতি পরিচিত একটি দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু চিকিৎসকমহল ও প্রখ্যাত মনোবিদরা বারবার সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, এই ধরণের মানসিক প্রতিক্রিয়া বা ঘন ঘন রাগ প্রকাশের প্রবণতা কেবল মানসিক শান্তির ব্যাঘাত ঘটায় না, বরং এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক বিরাট শারীরিক বিপদের আশঙ্কা। অতিরিক্ত রাগ মানুষের শরীরে এমন কিছু মারাত্মক হরমোনের নিঃসরণ ঘটায় যা দীর্ঘমেয়াদে ডেকে আনে একাধিক প্রাণঘাতী রোগ।

চিকিৎসকদের গবেষণা অনুযায়ী, যখন কেউ অতিরিক্ত রেগে যান এবং চেঁচামেচি শুরু করেন, তখন মানবদেহের সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে শরীরে প্রচুর পরিমাণে অ্যাড্রেনালিন এবং কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন বা চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন নিঃসৃত হতে থাকে। এই হরমোনগুলোর প্রভাবে তাৎক্ষণিকভাবে হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত হয়ে যায় এবং রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেশার মারাত্মক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। এই ধরনের মানসিক চাপ যদি নিয়মিত চলতে থাকে, তবে রক্তনালীর দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়, যা পরবর্তীতে হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

হৃদরোগ ছাড়াও অতিরিক্ত রাগের ফলে স্ট্রোকের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। যখন রক্তচাপ হঠাৎ করে খুব উঁচুতে পৌঁছে যায়, তখন মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে রক্তনালী ফেটে গিয়ে হেমারেজিক স্ট্রোক অথবা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে স্কিমিক স্ট্রোকের মতো মারাত্মক জীবন সংশয়ী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিৎকার বা মানসিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে নিমেষেই এক চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

শুধু কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম বা মস্তিষ্কই নয়, অতিরিক্ত রাগ মানুষের পরিপাকতন্ত্র এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী রাগ এবং মানসিক উত্তেজনার ফলে পাকস্থলীতে অতিরিক্ত এসিড উৎপন্ন হয়, যার জেরে বদহজম, গ্যাস্ট্রিক আলসার এবং ক্রনিক অ্যাসিডিটির সমস্যা স্থায়ী রূপ ধারণ করতে পারে। এছাড়া শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ায় শরীর ছোটোখাটো ইনফেকশন বা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। তাই সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন নিশ্চিত করতে হলে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং মানসিক শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।