শরীরে ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দিলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এবং অস্থিরতার মতো একাধিক সমস্যা শুরু হতে পারে। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে বয়স ২৫ বছর অতিক্রম করার পর শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও পুষ্টি উপাদানের চাহিদা আরও বাড়তে থাকে। এই সময় স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য কিছু নির্দিষ্ট ভিটামিন নিয়ম করে প্রতিদিন গ্রহণ করা অপরিহার্য।
শরীরকে সুস্থ রাখতে মোট ১৩টি ভিটামিনের প্রয়োজন। প্রতিটি ভিটামিনের নিজস্ব কার্যকারিতা রয়েছে এবং এদের অভাব শরীরে বিভিন্ন ধরনের অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিদিনের সুষম খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমেই শরীরে ভিটামিন প্রবেশ করা সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে বর্তমান জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের কারণে অনেক সময় ভিটামিন তো বটেই, প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানেরও ঘাটতি দেখা যায়। সেই কারণেই মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট বা বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, প্রতিদিনের খাবার এমন হওয়া উচিত যাতে ভিটামিনের চাহিদা পূরণ হয়।
নারীদের জন্য বিশেষভাবে জরুরি ৬টি ভিটামিন এবং তাদের উৎস নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. ভিটামিন বি কমপ্লেক্স (বিশেষত বি১২ ও ফোলেট): ভিটামিন বি-এর অভাব শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ভিটামিন বি১২-এর অভাবে মানসিক অবসাদ এবং ত্বকের বিবর্ণতা দেখা দিতে পারে। নিরামিষ খাবারে এই ভিটামিনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ডিম, মাশরুম, পালং শাক, বিভিন্ন ধরনের মাংস ও মেটে, সামুদ্রিক মাছ ভিটামিন বি১২-এর সমৃদ্ধ উৎস। এছাড়াও দুধ, দই ও ছানাতেও এই ভিটামিন পাওয়া যায়। ভিটামিন বি১২ স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা বজায় রাখতে, রক্ত তৈরি করতে এবং শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২. ভিটামিন সি: নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণ করলে ত্বকের বলিরেখা কমে, ঔজ্জ্বল্য বাড়ে। মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধিতেও এই ভিটামিনের ভূমিকা রয়েছে এবং এটি মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক। লেবু ও আমলকি ছাড়াও পেয়ারা, ব্রকোলি, স্ট্রবেরি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো এবং পালং শাকে ভিটামিন সি প্রচুর পরিমাণে থাকে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় টাটকা ফল ও সবজি যোগ করলে শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি-এর যোগান দেওয়া সম্ভব।
৩. ভিটামিন কে: হাড় ভেঙে যাওয়া বা হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার পেছনে ভিটামিন কে-এর অভাব একটি বড় কারণ। এই ভিটামিন হাড়কে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। শরীরে ভিটামিন কে-এর অভাব হলে গাঁটে গাঁটে ব্যথা হতে পারে। মহিলাদের জন্য এই ভিটামিন গ্রহণ করা বিশেষভাবে জরুরি, কারণ এর অভাবে অস্টিয়োপোরেসিসের ঝুঁকি বাড়ে। ব্রকোলি, পালং শাক ও বরবটি ভিটামিন কে-এর ভালো উৎস। দুগ্ধজাত খাবার, ডিম, মুরগির মাংস এবং সয়াবিনেও এই ভিটামিন ভরপুর মাত্রায় পাওয়া যায়।
৪. ভিটামিন ই: ভিটামিন ই হাড়ের যত্ন নেয়, বন্ধ্যাত্বের সমস্যা রোধে সাহায্য করে এবং বার্ধক্যজনিত সমস্যাও রুখতে পারে। ত্বকের ও চুলের যত্নে অনেকেই ভিটামিন ই ক্যাপসুল ব্যবহার করেন। চিকিৎসকদের মতে, প্রতিদিনের খাবার থেকেই এই ভিটামিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব, সাপ্লিমেন্টের তেমন প্রয়োজন হয় না। পালং শাক, অ্যাভোকাডো, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, সূর্যমুখীর তেল এবং চিনেবাদামে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই থাকে।
৫. ভিটামিন ডি: হাড় শক্তিশালী করতে এবং পেশির যত্ন নিতে ভিটামিন ডি অপরিহার্য। এটি শুধু হাড় মজবুতই করে না, অস্থিসংক্রান্ত নানা রোগ এবং অস্টিয়োপোরেসিসের ঝুঁকিও কমায়। এছাড়াও রোগ প্রতিরোধে ভিটামিন ডি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডিমের কুসুমে ভিটামিন ডি থাকে, তবে ডিমের খোলায় এর মাত্রা বেশি। দুধ ও দুগ্ধজাত যেকোনো খাবারে এবং মাংসের মেটে ও মাছের ডিমেও ভিটামিন ডি ভালো পরিমাণে পাওয়া যায়। মাশরুমেও ভিটামিন ডি থাকে এবং মাশরুমের স্যুপ খেলে উপকার পাওয়া যায়।
৬. ক্যালসিয়াম: শরীরে ভিটামিন ও সুষম খাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি হাড় ও দাঁত মজবুত রাখা, রক্তস্বল্পতা রোধ করা, শক্তি বজায় রাখা, হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখা এবং ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য ক্যালসিয়াম অত্যন্ত জরুরি। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, সবুজ শাকসবজি, বাদাম এবং বীজ ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্টও গ্রহণ করা যেতে পারে।
সুস্থ ও সক্রিয় জীবন যাপনের জন্য ২৫ বছর পেরোনো মহিলাদের এই ভিটামিনগুলো নিয়মিত গ্রহণ করা উচিত। প্রাকৃতিক উৎস থেকে ভিটামিন গ্রহণ করাই শ্রেয়, তবে প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।