জরুরি অবস্থার সেই বিভীষিকা! কেন পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল নিষিদ্ধ সিনেমার আসল প্রিন্ট?

জাতীয় জরুরি অবস্থার (১৯৭৫) সময় চলচ্চিত্র শিল্প চরম অস্থিরতার সম্মুখীন হয়েছিল। সংবাদপত্র ও রেডিওর মতো চলচ্চিত্রও যে গণযোগাযোগের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম, তা সেই সময়ে শাসকগোষ্ঠী ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিল। সেই কারণে সেন্সরশিপের কাঁচি তো ছিলই, এমনকি অনেক চলচ্চিত্রের প্রিন্ট পুড়িয়ে ফেলে জনমানস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। চলচ্চিত্রের এই শক্তি ও প্রতিরোধের ইতিহাস আজও প্রাসঙ্গিক।
জরুরি অবস্থার সময় গুলজারের ‘আন্ধি’ বা রমেশ সিপ্পির ‘শোলে’-কে কিছু দৃশ্য পরিবর্তনের শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক চলচ্চিত্রই সরাসরি নিষিদ্ধ হয়। বাংলা থেকে দক্ষিণ ভারত—প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ ছিল স্বৈরাচার ও সরকারি প্রচারযন্ত্রের বিরুদ্ধে এক তীব্র আক্রমণ। একইভাবে কন্নড় ভাষায় নির্মিত ‘চন্দা মারুতা’ ছিল প্রতিরোধের এক অনন্য দলিল। চলচ্চিত্রটির অভিনেত্রী স্নেহলতা রেড্ডি জরুরি অবস্থার সময় গ্রেপ্তার হন এবং কারাগারে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন। অসুস্থ অবস্থায় মুক্তি পেলেও তিনি অকালেই মারা যান। ফলে ১৯৭৭ সালে ছবিটি মুক্তি পেলেও তিনি তা দেখে যেতে পারেননি।
আবার ‘কিস্সা কুরসি কা’-র পরিচালক অমৃত নাহাতা ছিলেন খোদ কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ। ইন্দিরা ও সঞ্জয় গান্ধীর কর্মকাণ্ড নিয়ে তৈরি এই রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক সিনেমাটি সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ভি.সি. শুক্লার নির্দেশে এই ছবির সমস্ত প্রিন্ট বাজেয়াপ্ত করে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, যার জন্য পরবর্তীকালে শাহ কমিশন তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। ছবিতে শাবানা আজমি ও রাজ বাব্বরদের মতো নবাগতরা অভিনয় করলেও, ছবিটি শৈল্পিকভাবে খুব একটা সফল হয়নি; বরং এটি ইতিহাসে বেঁচে আছে সরকারের দমনের প্রতীক হিসেবে।
লেখ ট্যান্ডনের ‘আন্দোলন’ ছবিটি সরাসরি রাজনৈতিক না হলেও, সরকারবিরোধী বিপ্লবের বার্তা থাকায় একে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের আড়ালে তৎকালীন প্রশাসনিক অব্যবস্থাকে তোপ দেগেছিল ছবিটি। শেষে উল্লেখ করতে হয় আই.এস. জোহরের ‘নাসবন্দী’র কথা। জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ অভিযানের বিরুদ্ধে এই ব্ল্যাক কমেডিটি ছিল তৎকালীন সিস্টেমের গালে চপেটাঘাত। অমিতাভ বচ্চন, শশী কাপুর বা রাজেশ খান্নার আদলে তৈরি চরিত্রগুলোর মাধ্যমে জোহর জরুরি অবস্থার সমর্থক তারকাদেরও তীব্র উপহাস করেছিলেন। বাণিজ্যিক সাফল্য না পেলেও, এই ছবিটির গানগুলি আজও রাজনৈতিক প্রতিবাদের সুর হয়ে বেঁচে আছে। এই নিষিদ্ধ চলচ্চিত্রগুলোই প্রমাণ করে যে, দমন-পীড়নের সামনেও শিল্পীরা কীভাবে সাহসের সাথে কলম ও ক্যামেরার মাধ্যমে লড়াই চালিয়ে যান।