উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সেই কাল্পনিক ভূতের রাজার কথা মনে আছে? যিনি গুপি-বাঘাকে তিনটে বর দিয়েছিলেন। কিন্তু যদি আজ সেই ভূতের রাজা আবির্ভূত হন, তবে আজকের রবি আর দুলুর মতো খুদেদের আবদার কী হবে? পরিচালক প্রদীপ বিশ্বাসের নতুন সিনেমা ‘সেকেন্ড উইশ’ (Second Wish) ঠিক এই প্রশ্নটিই তুলে ধরেছে। এসএস এন্টারটেনমেন্টের প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবি সামাজিক বাস্তবতার এক অনন্য দলিল।
সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে রবি আর দুলুকে ঘিরে। একই ক্লাসের এই দুই পড়ুয়া পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকলেও তাদের চিন্তার জগত জুড়ে রয়েছে শুধুই অভাব আর ক্ষুধা। রবির বাবা ক্ষেতমজুর, আর দুলুর বিধবা মা লোকের বাড়ি কাজ করেন। দারিদ্র্যের অভিশাপে যাদের শৈশব কাটছে পেটের জ্বালা মেটাতে গিয়ে, তাদের কাছে ভূতের রাজা যেন এক শেষ আশা। তারা রাজার কাছে ভালোমন্দ খাবারের বর চাইবে বলে ঠিক করে। কিন্তু দ্বিতীয় বরটা কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তারা দ্বারস্থ হয় স্কুল মাস্টার তপনবাবুর। তখনই সিনেমার মোড় ঘুরে যায়। তপনবাবু ও দুই খুদে মিলে সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের দ্বিতীয় বর হবে—পৃথিবীর সব শিশু যেন দুবেলা পেট ভরে খেতে পায়।
সিনেমার সমান্তরালে ফুটে উঠেছে সমসাময়িক সমাজের আরও এক দর্পণ। শিক্ষক তপনবাবুর মেয়ে দিয়া এবং তার প্রেমিক সজলের প্রেমের বাধা হয়ে দাঁড়ায় তথাকথিত সামাজিক কৌলিন্য। তপনবাবু তার মেয়েকে রেলের বড় অফিসার কেশবের সঙ্গে বিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর, যেখানে পণপ্রথা ও যৌতুকের চাপ স্পষ্ট। আর্থিক স্বচ্ছলতা আর মনের মিলের লড়াইয়ে যখন সজল-দিয়ার সম্পর্ক ভাঙনের মুখে, তখন অন্য প্রান্তে রবি-দুলুদের মতো শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই চলতে থাকে।
সিনেমার কাহিনী মূলত দুই দশক আগের প্রেক্ষাপটে বোনা। আজ থেকে ২০ বছর আগে মিড-ডে মিল প্রকল্পের সূচনা কীভাবে রবি-দুলুদের মতো অসংখ্য স্কুলছুট শিশুর জীবন বদলে দিয়েছে, সেই জয়গানই গেয়েছেন পরিচালক। ছবিটিতে অভিনয় করেছেন দুর্নিবার মজুমদার, কৃষাণ নস্কর ও অধিরাজ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীরা। বিশেষ করে অধিরাজ, যিনি ‘মহানায়ক’-এর মতো সিরিয়াল ও ‘কাদম্বরী’-র মতো সিনেমায় নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন, তিনি এই সিনেমার গ্রামীণ আবেগকে জীবন্ত করে তুলেছেন। সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন অঙ্কুর দত্ত।
সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা অধিরাজ বলেন, “অনেক দিন পর বড় পর্দায় ফিরে ভালো লাগছে। গ্রামের বাচ্চাদের বড় হওয়ার লড়াই, তাদের জীবনসংগ্রাম ও উত্তরণের গল্প আমাকে আবেগপ্রবণ করেছে। অত্যন্ত পরিশ্রম করে আমরা এই সিনেমাটি তৈরি করেছি, আশা করি দর্শক আমাদের এই প্রয়াসের পাশে দাঁড়াবেন।”
বিশ্ব খাদ্যসূচকের পরিসংখ্যানে ভারত হয়তো কিছুটা পিছিয়ে, কিন্তু এই সিনেমা শুধু পরিসংখ্যান শোনায় না, শোনায় ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। রবি-দুলুদের মিড-ডে মিল থেকে সজল-দিয়ার প্রেমের পূর্ণতা—‘সেকেন্ড উইশ’ আসলে এক আশা জাগানিয়া চলচ্চিত্র, যা প্রতিটি মানুষের মনের গভীরে নাড়া দেবে।





