পুজোর কাটতেই ইডির জালে সন্দীপ ঘোষ! আরজি করের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে কড়া তলব

পুজোর ঠিক মুখেই সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পেয়ে জেলের বাইরে বেরিয়েছিলেন আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিতর্কিত প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ। কিন্তু উৎসবের আনন্দ মিটতেই তাঁর ওপর ফের নেমে এল কেন্দ্রীয় এজেন্সির খাড়া। হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার সরকারি তহবিল তছরূপ ও আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগে বুধবারই সন্দীপ ঘোষকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন দুপুরের মধ্যেই সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে অবস্থিত ইডির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তাঁকে সশরীরে হাজির দেওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আরজি কর হাসপাতালের অধ্যক্ষ পদে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর কার্যকালে আর্থিক লেনদেনে একাধিক গুরুতর অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির জোরালো প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি গোয়েন্দাদের। অতীতে হাসপাতালে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন আর্থিক কারচুপির হিসাবের অমিল ও অসঙ্গতি খতিয়ে দেখতেই তাঁকে এবার মুখোমুখি বসিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান ইডির তদন্তকারী আধিকারিকরা।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আরজি কর হাসপাতালের সেমিনার হলে এক তরুণী চিকিৎসককে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্ত শুরু হওয়ার পরই এই বিপুল আর্থিক দুর্নীতি ও কাঠামোগত বেনিয়মের পাহাড়চাপা সত্য প্রকাশ্যে আসে। সেই সময় অভিযোগ উঠেছিল যে, হাসপাতালের নিজস্ব অফিশিয়াল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে কোটি কোটি টাকার সরকারি তহবিল সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ ভেন্ডার ও ঠিকাদারদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। এই গুরুতর ঘটনার জেরে ওই বছরের ২৪ আগস্ট সিবিআইয়ের কলকাতা দুর্নীতি দমন শাখা একটি স্বতঃপ্রণোদিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করে এবং তদন্তে নেমে সন্দীপ ঘোষকে গ্রেপ্তার করেছিল।
পরবর্তীকালে বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন সন্দীপ কলকাতা হাইকোর্টে জামিনের আবেদন জানালে বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের একক বেঞ্চ সেই আবেদন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় খারিজ করে দিয়েছিল। হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, সরকারি জনকল্যাণমূলক তহবিলের এই ধরনের নয়ছয় সরাসরি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবায় চরম আঘাত হানার সামিল। পাশাপাশি, সন্দীপ ঘোষের প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, জামিন পেলে তিনি মামলার সাক্ষীদের প্রভাবিত করতে পারেন—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছিল।
অবশেষে গত ১৫ অক্টোবর সিবিআইয়ের দায়ের করা ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সন্দীপ ঘোষের জামিনের আবেদন মঞ্জুর করে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এমএম সুন্দরেশ ও বিচারপতি প্রসন্ন বি ভারালের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল যে, এই মামলার বিচারপর্ব অত্যন্ত শ্লথগতিতে চলছে। বিগত দুই বছর ধরে সন্দীপকে কারাবন্দি করে রাখা হলেও, আর্থিক দুর্নীতির এই মামলায় তালিকাভুক্ত মোট ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র সাত জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কথা মাথায় রেখেই শীর্ষ আদালত তাঁকে জামিন দিলেও, ইডির এই নতুন তলব তাঁর আইনি লড়াইকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির গোয়েন্দাদের জেরার মুখে পড়ে তিনি কী সাফাই দেন এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির কোন নতুন তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে গোটা রাজ্য।