দীপাবলিতে বাজির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠল? বড় সিদ্ধান্তের আগে কিসের সতর্কবার্তা দিল শীর্ষ আদালত?

পরিবেশ দূষণ রোধে আতশবাজি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করাই কি একমাত্র ও আদর্শ সমাধান? সম্প্রতি এই প্রশ্নটিকেই সামনে এনে এক চাঞ্চল্যকর পর্যবেক্ষণ পেশ করল সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের স্পষ্ট অভিমত, শুধু বাজি পোড়ানো বন্ধ করলেই যে বায়ুদূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, তার সপক্ষে এখনও পর্যন্ত পর্যাপ্ত কোনো তথ্য-প্রমাণ বা পরিসংখ্যান নেই। বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ এবং বিচারপতি প্রসন্ন বি বরালের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, বিগত ২০২৪ সালে দিল্লি-এনসিআর এলাকায় সম্পূর্ণ বাজি নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও বায়ুর গুণমান সূচক বা একিউআই (AQI)-তে কোনো উল্লেখযোগ্য বা ইতিবাচক উন্নতি লক্ষ্য করা যায়নি। এমনকি চলতি বছরেও উৎসবের দিনগুলিতে বায়ুদূষণের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণ আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেছে শীর্ষ আদালত।

তবে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পথে না হেঁটে সমস্ত দিক বিচার করে আসন্ন ৭ ও ৮ নভেম্বর, ২০২৬-এ দীপাবলির সময় নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে পরিবেশবান্ধব বাজি বা ‘গ্রিন ক্র্যাকার’ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, আগামী ৭ ও ৮ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে ৭টা এবং রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেবল গ্রিন ক্র্যাকার পোড়ানো যাবে। তবে এই ছাড় শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদিত এবং সিএসআইআর-নিরি (CSIR-NEERI) ও পেসো (PESO)-র শংসাপত্রপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব বাজিগুলির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। একই সঙ্গে আদালত কঠোর নির্দেশ দিয়েছে যে, হাসপাতাল, নার্সিংহোম, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বৃদ্ধাশ্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট সমস্ত নীরব এলাকার ৩০০ মিটারের মধ্যে বাজি পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে এবং ওই এলাকাগুলিকে কঠোরভাবে ‘নো-ক্র্যাকার জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি, কোনোভাবেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাজি বিক্রি করা যাবে না এবং শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ও অনুমোদিত স্থান থেকেই গ্রিন ক্র্যাকার বিক্রি করতে হবে। নিষিদ্ধ বাজি কেনাবেচা বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনকে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

শুনানি চলাকালীন প্রাচীন ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃতির প্রসঙ্গ টেনে আদালত জানিয়েছে, ‘স্কন্দপুরাণ’ এবং ‘পদ্মপুরাণ’-এর মতো প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থে দীপাবলি পালনের সময় মূলত প্রদীপ জ্বালানোর কথাই বলা হয়েছে। পরবর্তীকালে শতাব্দী প্রাচীন বারুদের প্রচলনের ফলেই মূলত এই উৎসবে আতশবাজি ফোটানোর আধুনিক প্রথার সূচনা ঘটে। সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, প্রতিটি নাগরিকের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের মধ্যে একটি সুস্থ, নির্মল ও দূষণমুক্ত পরিবেশে বেঁচে থাকার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার থাকলেও তা জনস্বাস্থ্য এবং অন্যান্য সাংবিধানিক বিধিনিষেধের ঊর্ধ্বে স্থান পেতে পারে না। দীপাবলি উৎসবের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্বকে সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়েও আদালত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছে যে, উৎসবের আনন্দের নামে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক আঘাত হানা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না।

দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থাও যে দূষণ মারাত্মক করে তোলে, সেকথা উল্লেখ করে আদালত জানিয়েছে যে সেখানকার ধীরগতির বাতাস দূষিত কণাগুলিকে সহজে সরে যেতে দেয় না। শীতকালে তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে এই পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল হয়ে ওঠে। বাজি থেকে নির্গত অতি সূক্ষ্ম কণাগুলি দীর্ঘকাল বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের রক্তপ্রবাহে মিশে গিয়ে শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের মারাত্মক শারীরিক ক্ষতিসাধন করে। এই পুরো বিষয়ের ওপর নজরদারি রাখতে সরকারি সংস্থাগুলিকে দীপাবলির পরেও নিয়মিত দূষণের মাত্রা পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একিউআই-এর তথ্যের পাশাপাশি দূষণজনিত কারণে হাসপাতালে রোগী ভর্তির হার এবং মৃত্যুর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে তা আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত জানিয়েছে যে, আগামী ৯ নভেম্বর থেকে সারা বছর ফের বাজি পোড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে এবং দীপাবলির পর দূষণের প্রভাব নিয়ে রাজ্যগুলিকে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানি ধার্য করা হয়েছে।