“বিজয়া মিটেছে ১০ দিন আগে, তবু খোলা হয়নি পুজোর প্যান্ডেল!”-কারণ জানলে চোখে জল আসবে!

বিজয়া দশমী পেরিয়ে গিয়েছে প্রায় দশ দিন। দেবীকে বিদায় জানিয়ে চারপাশ থেকে যখন একে একে নামছে পুজোর রেশ, ঠিক তখনই চুঁচুড়ার সুকান্তনগরের চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা। প্যান্ডেল খোলার তোড়জোড় তো দূরঅস্ত, উল্টে এক অনন্য মানবিক ও ভালোবাসার নজির গড়েছেন এলাকার যুবকরা। পুজোর প্যান্ডেলের ছাদেই সংসার পেতেছে একজোড়া ঘুঘু পাখি। নতুন প্রাণের জন্ম আর তাদের আকাশে ওড়ার অপেক্ষায় আপাতত প্যান্ডেল ভাঙার কাজ স্থগিত রেখেছেন ‘সুকান্ত স্মৃতি সঙ্ঘ’-এর সদস্যরা।

প্যান্ডেলের ছাদেই ঘুঘুর বাসা ও ডিম ফুটিয়ে ছানা!

এবারের পুজোয় সুকান্ত স্মৃতি সঙ্ঘের মূল থিম ছিল ‘সাচী স্তূপ’—যা গৌতম বুদ্ধের স্মৃতি, অহিংসা ও প্রেমের বার্তা বহন করে। পুজো কমিটির সদস্যরা নিজেরাই প্যান্ডেলের সমস্ত কাজ হাতে করে করেছিলেন। আর তখনই পুজোর দিন পনেরো বাকি থাকতে প্যান্ডেলের সিলিংয়ে বাসা বাঁধতে শুরু করে একজোড়া ঘুঘু। সিলিং তৈরির সময় দেখা যায়, সেই বাসায় রয়েছে চারটি ডিম!

ব্যাস, তারপর থেকেই বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি। প্যান্ডেলের নান্দনিক সৌন্দর্য একটু কমতে পারে, এই আশঙ্কায় বাসার উপরে কোনো পলিথিন বা ত্রিপল টানেননি তাঁরা। বরং বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে বাসার উপর টাঙিয়ে দেওয়া হয় নরম কাপড়। পুজো মিটল, প্রতিমা বিসর্জন হলো, এমনকি লক্ষ্মীপুজো পেরিয়ে কালীপুজোর দোরগোড়ায় এসেও প্যান্ডেল খোলার নাম নেই। পুজো কমিটির সম্পাদক প্রণব পালের সাফ কথা, “আগে ডিম ফুটে সব ছানা বেরোক, তারা আকাশে উড়তে শিখুক। তার পরেই প্যান্ডেল ভাঙার কাজ হাত দেব।” ইতিমধ্যে একটি ছানা সুস্থভাবে উড়ে গেলেও বাকি তিনটি ছানার ওড়ার অপেক্ষাতেই থমকে রয়েছে আয়োজন।

পঞ্জিকা মেনে চলে না প্রকৃতির সংসার

চুঁচুড়ার জিটি রোডের পাশেই এই পুজোর অবস্থান। তাই সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য প্যান্ডেলের সামনের অংশটুকু সামান্য খোলা হলেও ভেতরের মূল অংশটি হুবহু অক্ষত রাখা হয়েছে। পুজো কমিটির সদস্য মনোজ মণ্ডল আবেগপ্রবণ কণ্ঠে বলেন, “ওদেরও তো এই পৃথিবীতে বাঁচার সমান অধিকার রয়েছে।” সদ্যোজাত ছানাদের এক ঝলক দেখতে সকাল-বিকেল প্যান্ডেলের নিচে ভিড় জমাচ্ছেন এলাকার কচিকাঁচারা থেকে শুরু করে বয়স্করা পর্যন্ত।

প্রকৃতির এমন মায়াবী দৃশ্য দেখে কুর্নিশ জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের ব্যান্ডেল-মগরা বিজ্ঞান কেন্দ্রও। সংগঠনের সম্পাদক সন্দীপ সিং এই ঘটনাকে ‘অত্যন্ত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করে জানিয়েছেন যে, সমাজের সর্বস্তরে এই পরিবেশবান্ধব চেতনা ছড়িয়ে দিতে পুজো কমিটিকে বিশেষ সংবর্ধনা জানানো হবে।

দেবী কৈলাসে ফিরে গিয়েছেন, প্যান্ডেলের চকমকে আলোও নিভেছে। কিন্তু সুকান্ত স্মৃতি সঙ্ঘের প্যান্ডেলের ছাদ আজ আলোকিত নতুন জীবনের ছান্দসিক আনন্দে।