“ব্যক্তিগত মতামত, কমিশনের অফিশিয়াল নির্দেশ নয়!” নির্বাচন কমিশনের বেনজির বিবাদ নিয়ে চরম অবস্থান কেন্দ্রীয় সরকারের

নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) অন্দরে এক অভূতপূর্ব দ্বন্দ্ব ও মতভেদের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এল। কমিশনেরই প্রবীণ আইএএস অফিসার মণীশ গর্গের বিরুদ্ধে মারাত্মক কিছু অভিযোগ তুলে ক্যাবিনেট সচিবালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী। তবে তাঁদের সেই আর্জি খারিজ করে দিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবালয় (Cabinet Secretariat)। সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কমিশনাররা যে চিঠি দিয়েছেন তা তাঁদের ‘ব্যক্তিগত মতামত’। এটি পুরো নির্বাচন কমিশনের যৌথ বা অফিশিয়াল সিদ্ধান্ত নয়। তাই এতে পদক্ষেপ নেওয়া হলে স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থার কাজে বাইরের হস্তক্ষেপ মনে করা হতে পারে। সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত কমোডর লোকেশ কে বাত্রার তোলা একটি তথ্য জানার অধিকার (RTI) আবেদনের উত্তরে পিটিআই (PTI) এই বিস্ফোরক তথ্য সামনে এনেছে।
ঠিক কী অভিযোগ ছিল প্রবীণ অফিসারের বিরুদ্ধে?
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৯ জুলাই। দুই নির্বাচন কমিশনার পৃথকভাবে তৎকালীন ক্যাবিনেট সচিব টি ভি সোমনাথনকে চিঠি লেখেন। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কমিশনে আসা আইএএস অফিসার মণীশ গর্গ প্রশাসন বিভাগের দায়িত্ব পাওয়ার পর, কমিশনারদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই পদস্থ আধিকারিকদের কাজের দায়িত্ব সম্পূর্ণ বদলে দেন। লিখিত ও মৌখিকভাবে বারণ করা সত্ত্বেও তিনি নিজের মনমতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। এমনকি নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশীর অভিযোগ, তিনি একটি নির্দিষ্ট নথি বা ফাইল দেখতে চাইলেও মণীশ গর্গের অধীনস্থ বিভাগ তাঁকে সেই ফাইল প্রদান করেনি। দুই কমিশনারের মতে, এই ধরনের একতরফা কাজ ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশন আইন ও পুরনো নিয়মের পরিপন্থী।
কেন পদক্ষেপে অসম্মতি ক্যাবিনেট সচিবালয়ের?
পাঁচ আগস্ট কমিশনারদের চিঠি হাতে পাওয়ার পর ক্যাবিনেট সচিবালয় বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখে তা সরকারি কর্মী বিভাগ (DoPT) এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দপ্তরে পাঠিয়ে দেয়। তবে সচিবালয় স্পষ্ট জানিয়েছে যে, “কমিশনারদের চিঠি দুটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হলেও, তা পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল সিদ্ধান্ত নয়।”
ক্যাবিনেট সচিবালয়ের নোটে জোর দিয়ে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা। ২০২৩ সালের আইনের ১৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কমিশনের অন্দরের সমস্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে অভ্যন্তরীণ বৈঠকেই সমাধান করা উচিত। অফিশিয়াল প্রস্তাব ছাড়া সরকার যদি মণীশ গর্গের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেয়, তবে তা সাংবিধানিক সংস্থার স্বাধীনতায় সরকারের হস্তক্ষেপ বা অনুপ্রবেশ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
কমিশনারদের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা
এই ঘটনা সামনে আসতেই জাতীয় রাজনীতি ও প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। কমিশনের ভেতরের সমস্যা নিজেদের বৈঠকে না মিটিয়ে কেন দুই কমিশনার সরাসরি ক্যাবিনেট সচিবের দ্বারে কড়া নাড়লেন, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাক্ষাৎকারে সাবেক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা প্রশ্ন তুলেছেন, এই আপত্তিগুলি নিয়ে কমিশনের অন্দরে আদৌ কি কোনো আলোচনা হয়েছিল? রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব প্রশ্ন তোলেন, দুই কমিশনার কেন ফুল-বেঞ্চ বৈঠক ডাকলেন না, আর যদি তাতে কাজ না হতো তবে কেন রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হলেন না?
কমিশনের সাফাই ও বর্তমান পরিস্থিতি
বিতর্ক উসকে ওঠার পর গত ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয় যে, কমিশনারদের আপত্তির পর মণীশ গর্গের জারি করা কাজের পুনর্বণ্টনের আদেশটি কার্যকর করা হয়নি। কমিশন আরও যোগ করেছে, ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো ওই চিঠিটি কেবল একজন ডেপুটেশনে থাকা আধিকারিককে কেন্দ্র করে এবং এর সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনার মূল নীতি বা ভোটার তালিকা সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে ক্যাবিনেট সচিবালয় বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই নথি তৈরি রেখে দিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে ওই অফিসারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সমস্ত তথ্য সামনে থাকে।