“জলে কি সত্যিই ভেসেছিল ‘রাম’ নাম লেখা পাথর?-রামসেতুর নেপথ্যের গল্প ও রহস্য ফাঁস

ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাঝখানে সমুদ্রের বুকে পাথর, বালি ও চুনাপাথরের এক দীর্ঘ সারি যুগ যুগ ধরে মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে। ভারতের রামেশ্বরম থেকে শ্রীলঙ্কার মান্নার দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত এই ভৌগোলিক গঠন সাধারণভাবে ‘রামসেতু’ এবং আন্তর্জাতিক মহলে ‘অ্যাডামস ব্রিজ’ নামে পরিচিত। রামায়ণ অনুসারে সীতাকে উদ্ধারের জন্য রামচন্দ্রের বানরসেনা এই পথ তৈরি করেছিল বলে বিশ্বাস করা হলেও, আধুনিক বিজ্ঞান ও উপগ্রহচিত্রের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের।

রামায়ণে কী বলা হয়েছে?

বাল্মীকি রামায়ণের কাহিনি অনুযায়ী, লঙ্কার দিকে যাত্রা করার সময় সমুদ্রের সামনে এসে পথ তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়ে। সেই সময় নল নামে এক দক্ষ নির্মাতার নেতৃত্বে মাত্র পাঁচ দিনে সেতু তৈরির কাজ শেষ করেছিল বানরসেনা। বড় বড় পাথর, গাছের গুঁড়ি ও অন্যান্য উপকরণ সমুদ্রে ফেলে এই পথ তৈরি করা হয়েছিল বলে ধর্মীয় পরম্পরায় উল্লেখ রয়েছে। তবে ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত পৌরাণিক কাহিনি এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সিদ্ধান্ত যে সম্পূর্ণ আলাদা, তা বারবার স্পষ্ট করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘রাম’ নাম লিখলে কি পাথর জলে ভাসে?

রামসেতুকে ঘিরে বহু লোকপ্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো পাথরে ‘রাম’ নাম লিখলে তা জলে ডুবে না গিয়ে ভেসে থাকে। এই গল্প বহু মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকলেও, এর নেপথ্যে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বিজ্ঞানের মতে, কোনো বস্তু জলে ভাসবে কি না, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সেই পাথরের ঘনত্ব, অভ্যন্তরীণ গঠন এবং তার ভেতরে থাকা বায়ুর পরিমাণের ওপর। নাম লেখার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এছাড়া সেতু নির্মাণের সময় এক ছোট কাঠবিড়ালির বালি দিয়ে সাহায্য করার গল্পও প্রচলিত রয়েছে, যা সকলের কাছেই বেশ জনপ্রিয়।

সমুদ্রের গভীরে আসলে কী রয়েছে?

রামেশ্বরম ও শ্রীলঙ্কার মান্নার দ্বীপের মাঝের সমুদ্র অঞ্চলে অগভীর জল, বালির চর এবং চুনাপাথরের এক ধারাবাহিক গঠন রয়েছে। উপগ্রহচিত্রের মাধ্যমে এই অঞ্চল অত্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো গঠন উপগ্রহ থেকে স্পষ্টভাবে দেখা গেলেই তার নির্মাতা বা সঠিক বয়স সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। শুধু ছবি দেখে তার ভূতাত্ত্বিক উৎপত্তি বা মানুষের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা প্রমাণ করা যায় না।

নাসা কি রামসেতুকে মানবনির্মিত বলেছে?

২০০৭ সালে রামসেতুর উপগ্রহচিত্র প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই দাবি করা হয় যে নাসা নাকি প্রমাণ করে দিয়েছে এটি মানুষের তৈরি। তবে এই দাবি সম্পূর্ণ সত্য নয়। নাসার প্রকাশিত ছবিতে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাঝের এই ভৌগোলিক গঠন ধরা পড়লেও, এটিকে রামচন্দ্রের বানরসেনার তৈরি বলে কোনো দিনই সিলমোহর দেয়নি মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। এই গঠনের উৎপত্তি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হয়েছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।