পুজোর আগে যজমান বা পূজার সামগ্রীতে জল ছিটানো হয় কেন? জানুন এর পিছনের গভীর রহস্য!

সনাতন হিন্দু ধর্মে পূজা-পাঠ কেবল নির্দিষ্ট কিছু দেব-দেবীর আরাধনা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে বহু প্রাচীন ও গভীর আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য। সনাতন সংস্কৃতিতে প্রায়শই দেখা যায়, পূজার শুরুতে পুরোহিত মহাশয় যজমান, পূজার সামগ্রী এবং গোটা পূজা স্থলের ওপর মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে পবিত্র জল ছিটিয়ে দেন। এই বিশেষ আচারটি সম্পন্ন করার সময় মূলত ‘ওঁ অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাवस्थाং গতোঽপি বা, যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং সঃ বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ’ এই অত্যন্ত প্রভাবশালী মন্ত্রটি উচ্চারণ করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পবিত্র মন্ত্রটির মূল তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে ভগবান বিষ্ণুর মহিমার মাঝে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, মানুষ দৈনন্দিন জীবনের যেকোনো অবস্থাতেই থাকুক না কেন, যদি সে পরম শ্রদ্ধায় ভগবান বিষ্ণুর নাম স্মরণ করে, তবে সে বাহ্যিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হয়ে ওঠে।

পূজার আগে জল ছিটানোর আসল উদ্দেশ্য কী?
সনাতন ধর্মে পূজার প্রাক্কালে জল ছিটানোর এই প্রক্রিয়াটিকে মূলত বিশুদ্ধিকরণের এক অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, পূজার আসনে বসার পূর্বে শুধুমাত্র দৈহিক পরিচ্ছন্নতা অর্জনই যথেষ্ট নয়, বরং বাহ্যিক কোলাহল থেকে মনকে সম্পূর্ণ শান্ত, সংযত এবং পবিত্র করে পূজার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করাও সমানভাবে জরুরি। আর সেই কারণেই শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পূজার আগে এই জল ছিটানোর প্রথা পালন করা হয়।

‘ওঁ অপবিত্রঃ পবিত্রো वा’ মন্ত্রটির তাৎপর্য কোথায়?
পূজা চলাকালীন উচ্চারিত এই বিশেষ মন্ত্রটিতে ভগবান বিষ্ণুকে ‘পুণ্ডরীকাক্ষ’ অর্থাৎ পদ্মের ন্যায় সুন্দর ও কোমল নয়নের অধিকারী হিসেবে স্মরণ করা হয়। এই মন্ত্রের মূল ভাবনা হলো, মানবজীবন নানা প্রতিকূলতা ও পরিস্থিতিতে ঘেরা থাকলেও, ভগবানের প্রকৃত স্মরণ মানুষের অন্তরে দিব্য পবিত্রতা ও স্বচ্ছতার অনির্বাণ ভাব জাগিয়ে তোলে। ঠিক এই কারণেই পুরোহিত মহাশয় যজমানের ওপর জল ছিটিয়ে এই মন্ত্রের আবৃত্তি করে থাকেন।

জল এবং ভগবান বিষ্ণুর মধ্যে যোগসূত্র কী?
হিন্দু পৌরাণিক বিশ্বাস ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় জলকে মানবজীবনের মূল ভিত্তি এবং পরম পবিত্রতার প্রতীক বলে মনে করা হয়। শ্রীবিষ্ণুর আদি অনন্ত ক্ষীरसाগরে শয়ন এবং তাঁর নাভিকমল থেকে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা জির আবির্ভাবের প্রাচীন পৌরাণিক উপাখ্যান জল ও সমগ্র সৃষ্টির গভীর যোগসূত্রকেই সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে। এই বিশেষ পদ্ম থেকেই ব্রহ্মা জি সৃষ্টি রচনা করেছিলেন, যে কারণে হিন্দু পূজাপদ্ধতিতে জলের স্থান অত্যন্ত পবিত্র ও অনন্য।

জল ও পদ্মের সঙ্গে এই ঐতিহ্যের যোগ কেন?
হিন্দু ধর্মে পদ্ম ফুলকে পবিত্রতা, নিষ্কলুষতা এবং নির্লিপ্ততা বা अनासक्ति-র সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। পদ্মফুল জলের মধ্যেই জন্মায় এবং প্রস্ফুটিত হয়, অথচ তার পাতার ওপর জলের এক ফোঁটাও বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারে না। এই অপূর্ব প্রাকৃতিক উদাহরণ থেকেই মানুষের জীবনের এক পরম ও গভীর দার্শনিক শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, একজন মানুষকেও এই দুনিয়ায় সংসারের নানা দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে বেঁচে থাকতে হবে, কিন্তু মোহ-মায়ার অন্ধকূপে সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়া চলবে না। পূজার ঠিক আগে জলের এই ছিটে দেওয়ার আচারটি মনকে যাবতীয় পার্থিব লোভ ও মোহ থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণভাবে ঈশ্বরের চরণে সমর্পিত করার এক অনন্য মানসিক প্রস্তুতি।

पूजन सामग्री पर जल क्यों छिड़का जाता है? (पूजन सामग्री पर जल छिड़कने का रहस्य)
শুধুমাত্র যজমান বা স্থানই নয়, পূজায় ব্যবহৃত প্রতিটি পবিত্র উপাদান ও সামগ্রীকেও শুদ্ধ করার প্রাচীন নিয়ম রয়েছে। ফুল, অক্ষত, ফল, প্রদীপ, কলশ এবং অন্যান্য পূজার উপাচারে জল ছিটিয়ে সেগুলিকে বিশেষভাবে পবিত্র করা হয়। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, এই শুদ্ধিকরণের মাধ্যমেই সমস্ত পূজাসামগ্রীকে সর্বোচ্চ ভক্তি ও পবিত্র ভাবের সঙ্গে পরম শ্রদ্ধায় ভগবানের উদ্দেশ্যে সমর্পণ করা সম্ভব হয়।

শঙ্খের জলের বিশেষ আধ্যাত্মিক গুরুত্ব কী?
হিন্দু শাস্ত্র ও আচারে শঙ্খকে অত্যন্ত পবিত্র ও মাঙ্গলিক বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বহু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও তান্ত্রিক অনুষ্ঠানে পবিত্র শঙ্খে জল ভরে তা সারা পূজা প্রাঙ্গণে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, শঙ্খের এই পবিত্র জল ছিটিয়ে দিলে চারপাশের সমগ্র পরিবেশ ও পূজা স্থলের সমস্ত নেতিবাচক শক্তি দূর হয়ে এক দিব্য ও পবিত্র বায়ুমণ্ডল গড়ে ওঠে।