টলিপাড়ায় নেমে এল গভীর শোকের ছায়া! মাকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন খ্যাতনামা সঙ্গীত পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত

টলিপাড়ায় ফের নেমে এল শোকের ছায়া। প্রয়াত হয়েছেন বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের মা মল্লিকা দাশগুপ্ত। গত ২৫ সেপ্টেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে চিরতরে বিদায় নিলেন মল্লিকাদেবী। তাঁর প্রয়াণে শোকের আবহ গোটা বাঙালি চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত জগতে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি ঘটায় গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল মল্লিকাদেবীকে। সেখানে দ্রুত শুরু হয় চিকিৎসা। কিন্তু বয়সজনিত কারণে শারীরিক পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ঘটে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মায়ের এই আকস্মিক প্রয়াণে স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছেন ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত এবং তাঁর পরিবার। তাঁর এই দুঃসংবাদে টলিউডের বহু তারকা ও কলাকুশলী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

২০০৩ সাল থেকে বাংলা চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার মাধ্যমে নিজের কেরিয়ার শুরু করেছিলেন ইন্দ্রদীপ। তাঁর সুর ও আবহসঙ্গীত যুগে যুগে দর্শক-শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছে। ‘মহুল বনির সেরেং’, ‘প্রলয়’, ‘মিশর রহস্য’, ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘২২শে শ্রাবণ’-এর মতো একাধিক আইকনিক ছবিতে সুর দিয়েছেন তিনি। একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন নিজের প্রতিভার জোরে। কিন্তু এতসব সাফল্যের পেছনেও যে মা এবং তাঁর অদম্য সমর্থন ছিল, তা আজ আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে।

ইন্দ্রদীপের মায়ের প্রয়াণে শুধু পরিবার নয়, শোকের ছায়া নেমে এসেছে তাঁর বন্ধুদের মহলেও। বন্ধু ও মায়ের সেই স্নেহের সম্পর্ক তুলে ধরে সম্প্রতি এক আবেগঘন ফেসবুক পোস্ট করেছেন অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। গত ৫ অক্টোবর ইন্দ্রদীপের মায়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যোগ দিয়ে পুরনো দিনের স্মৃতিচারণা করেছেন তিনি। রুদ্রনীল লিখেছেন, নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে যখন হাওড়া থেকে কলকাতায় এসে কাজের লড়াই চালাতেন, তখন জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন। অনেক সময় বাসের ভাড়া দিতে গেলেই পকেটে খাবারের টাকা থাকত না। সেই দুর্দিনে যে গুটিকয়েক বন্ধুর বাড়ি তাঁর কাছে নিরাপদ আশ্রয়ের মতো ছিল, তার মধ্যে ইন্দ্রদীপের বাড়ি অন্যতম।

স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে রুদ্রনীল জানান, ক্ষুধার্ত অবস্থায় ইন্দ্রদীপের বাড়ি পৌঁছলে, ইন্দ্রদীপ উপস্থিত না থাকলেও মল্লিকাদেবী ঠিক বুঝে যেতেন রুদ্রনীল কিছু খাননি। কোনও প্রশ্ন না করে, কোনো বাড়তি কথা না বলে পরম স্নেহে নিজের হাতে ভাত বেড়ে দিতেন তিনি। মল্লিকাদেবীর মধ্যে যেন সাক্ষাৎ মা অন্নপূর্ণার মতো এক নিঃশব্দ মমতা ও ছায়া কাজ করত। খাওয়ানোর পর তাঁর সেই শান্ত দৃষ্টি আজও রুদ্রনীলের মনে গেঁথে রয়েছে।

রুদ্রনীল আরও লিখেছেন, প্রতিটি মানুষই একেকটি বইয়ের পাতার মতো, কিন্তু আসল গল্পটা লুকিয়ে থাকে প্রচ্ছদের আড়ালে। আর সেই উপন্যাসের নাম যদি ‘মা’ হয়, তবে তার গভীরতা শব্দে মাপা যায় না। মল্লিকাদেবী তাই শুধু একজন সঙ্গীত পরিচালকের মা হিসেবে সীমাবদ্ধ রইলেন না; বরং বহু কঠিন সময়ে অসহায় তরুণদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক টুকরো আশ্রয়ের ঠিকানা। তাঁর এই নিঃশব্দ মমতা ও ভালোবাসার স্মৃতি চিরকাল বেঁচে থাকবে তাঁদের হৃদয়ে।