“কাটমানি-সিন্ডিকেট -প্রতিশ্রুতি!”-বিজেপির ১৫০ দিনে কি সত্যিই বদলাল বাংলার শাসন সংস্কৃতি?

বাংলার রাজনীতিতে গত ৪ মে এক ঐতিহাসিক পালাবদলের সাক্ষী থেকেছে রাজ্যবাসী। টানা ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছে বিজেপি। ‘এবার আসল পরিবর্তন’-এর স্লোগান তুলে রাজ্যে সরকার গড়ার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনের কেটে গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ১৫০ দিন। এই দেড়শো দিনে বাংলায় ঠিক কী কী পরিবর্তন এল এবং শাসক বদলালেও পুরনো শাসন সংস্কৃতিতে আদৌ কোনো আঁচড় পড়েছে কি না, তা নিয়ে এখন তুমুল চর্চা চলছে রাজনৈতিক মহলে।
কল্যাণমূলক প্রকল্প ও কেন্দ্রীয় স্কিমের প্রত্যাবর্তন
ক্ষমতায় এসেই বিগত সরকারের একাধিক নীতির খোলনলচে বদলে দিয়েছে নতুন প্রশাসন। তৃণমূল সরকারের জনপ্রিয় প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর পরিবর্তে চালু হয়েছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি যোগ্য মহিলারা সরাসরি অ্যাকাউন্টে (ডিবিটি) প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে পাচ্ছেন। রাজ্য সরকারের দাবি, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় দেড় কোটি মহিলা এই প্রকল্পের চতুর্থ কিস্তির টাকা হাতে পেয়েছেন।
পাশাপাশি, অতীতে যে সমস্ত কেন্দ্রীয় প্রকল্প রাজ্যে আটকে ছিল, তা চালুর ক্ষেত্রেও গতি এসেছে। চিংড়িহাটা মোড়ের মেট্রোজট দূর করা থেকে শুরু করে সীমান্ত সুরক্ষায় বিএসএফ-কে দ্রুত জমি হস্তান্তর—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তৎপরতা দেখিয়েছে শুভেন্দু সরকার। ‘সূর্য ঘর যোজনা’ সহ একাধিক কেন্দ্রীয় স্কিম এখন পুরোদমে কার্যকর হচ্ছে রাজ্যে।
বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জোয়ার
বিজেপির ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে শিল্প মহলেও। সেপ্টেম্বর মাসের হিসাব অনুযায়ী, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই ৩৩টি শিল্প প্রকল্পের জন্য জমি বরাদ্দ করেছে। এর হাত ধরে প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং প্রায় ৬২,০০০ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দুর্গাপূজার আগেই একটি নতুন শিল্পভূমি নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যেই আমুলের ৭০০ কোটি টাকার দুগ্ধ প্রকল্প এবং ডানকুনিতে লাক্স কোজির ৬০০ কোটি টাকার সম্প্রসারণ প্রকল্প বাংলায় বড় বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করেছে। পরিকাঠামো খাতে ওয়াটার মেট্রো, আন্তঃনগর মেট্রো এবং কল্যাণীতে গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর তৈরির মতো সুদূরপ্রসারী প্রকল্প নিয়েও আলোচনা চলছে।
আইনশৃঙ্খলা ও বিতর্ক: মুদ্রার অন্য পিঠ
উন্নয়নের খতিয়ানের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম থেকেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে নতুন সরকার। শাসক দলের দাবি, তোলাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বহু পুলিশ আধিকারিক ও সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত বা গ্রেফতারির ঘটনাও ঘটেছে।
তবে এর বিপরীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা এবং বিরোধী দলগুলির কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন চলছে, পুরনো দলের বহু কর্মী-নেতা বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় দলের অন্দরেই ‘তৃণমূলীকরণ’-এর মতো অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠছে। যদিও এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে রাজ্য বিজেপি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তৃণমূল ছেড়ে আসার সমস্ত পথ ৪ মে থেকেই চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।