‘প্রশাসনের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়, দেশ গড়তে রাজনীতি প্রয়োজন’! সিবিআইয়ের চ্যাপ্টার ক্লোজ করে নতুন দলের দায়িত্বে নাগেশ্বর

প্রশাসনিক জীবনের দীর্ঘ চার দশক পার করে এবার সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে পা রাখলেন সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বা সিবিআই-এর প্রাক্তন অন্তর্বর্তী ডিরেক্টর এম নাগেশ্বর রাও। উত্তরপ্রদেশের বারাণসী বা কাশী থেকে জীবনের এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করলেন তিনি। ‘সর্বজন সনাতন পার্টি’-র সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন এই প্রবীণ প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিক।

শনিবার কাশীতে এক অনুষ্ঠানে দায়িত্ব গ্রহণের পর সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাগেশ্বর রাও জানান, তাঁর দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাই তাঁকে রাজনীতিতে যোগ দিতে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করেছে। তাঁর মতে, কেবল প্রশাসনিক পদ বা দায়িত্ব সামলানোই দেশ গঠনের জন্য যথেষ্ট নয়, প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে রাজনীতির ময়দানে নেমে সরাসরি যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে নিজের শেকড় এবং সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকার ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি।

নাগেশ্বর রাও স্পষ্ট করে জানান যে সনাতন ধর্ম কেবল কিছু নির্দিষ্ট পুজো-আচ্চার গণ্ডীতে আবদ্ধ কোনো আচার-অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি জীবনকে দেখার একটি সামগ্রিক ও সুদূর প্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর কথায়, সনাতন আসলে সত্য, ধর্ম, কর্তব্য, করুণা, ন্যায়, সংযম, প্রকৃতি, পরিবার, সমাজ এবং সামগ্রিক জনকল্যাণের নীতি ও আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

নিজের নতুন রাজনৈতিক দল সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি দলের মূল ভিত্তি ও আদর্শের চারটি প্রধান স্তম্ভ তুলে ধরেন। প্রথমত, ভারতীয় সভ্যতা, ইতিহাস ও জ্ঞানের সুপ্রাচীন পরম্পরার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার মেলবন্ধন। দ্বিতীয়ত, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী পরম্পরার সংমিশ্রণে সাধারণ মানুষের জন্য সেবামূলক স্বাস্থ্য পরিষেবা। তৃতীয়ত, যুবসমাজ, কৃষক, কারিগর, শ্রমিক ও ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সম্মানজনক আয়ের সংস্থান বা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। চতুর্থত, ভাষা, কলা, মন্দির, তীর্থক্ষেত্র, উৎসব এবং পরিবার সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রের মূল শক্তির উৎস হিসেবে গণ্য করা।

তবে দল অতীতমুখী নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। নাগেশ্বরের দাবি, তাঁরা দেশকে কোনোভাবেই অতীতের অন্ধকারে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান না; বরং আধুনিক প্রযুক্তি এবং উন্নত অর্থব্যবস্থার সঙ্গে একটি সুদৃঢ় সাংস্কৃতিক পরিচিতি সম্পন্ন শক্তিশালী ভারত গড়ে তোলাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, “সনাতন কেবল কোনো রাজনৈতিক বা নির্বাচনী প্রতীক নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর গভীর মূল্য রয়েছে। সমাজে সকলের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।” তাঁর আরও দাবি, তাঁদের দল কোনো জাতি, ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিরোধী নয় এবং বিভাজনের রাজনীতি এড়িয়ে সকলের কল্যাণে কাজ করতে চায়। সর্বজন সনাতন পার্টির এই নতুন কার্যনির্বাহী কমিটিতে মহন্ত তীর্থানন্দ এবং রীতু রাঠৌরের মতো বিশিষ্ট মুখগুলিও জায়গা পেয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে সিবিআই সংস্থার অন্দরে তৎকালীন ডিরেক্টর অলোক বর্মা এবং স্পেশাল ডিরেক্টর রাকেশ আস্থানার মধ্যে চরম ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েনের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সেই ক্রান্তিলগ্নে সিবিআই সংস্থার অন্তর্বর্তীকালীন শীর্ষ দায়িত্বভার এসে পড়েছিল এম নাগেশ্বর রাওয়ের কাঁধে। তবে সেই সময় তাঁর নেওয়া বেশ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক তছরুপের গুরুতর অভিযোগের পাশাপাশি তদন্তে নিজস্ব প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উঠেছিল। এমনকি চর্চা ছিল যে, নিজের স্ত্রীর সংস্থাকে আইনি ঝামেলা থেকে বাঁচাতে আলোচিত সারদা চিটফান্ড মামলার তদন্তের গতি শ্লথ করে দেওয়া হয়েছিল। সমস্ত বিতর্ক ও অতীত বিতর্ক পেছনে ফেলে এবার পুরোপুরি নতুন এক রাজনৈতিক সমীকরণে অবতীর্ণ হলেন এই প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধান।