বিশ্বজুড়ে তেলের হাহাকারে মধ্যেই রেকর্ড আমদানি,কোথা থেকে এত তেল পাচ্ছে ভারত?

বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে বর্তমানে চরম টানাপড়েন চলছে। পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও, যেখানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ব্যারেল প্রতি ১০২ ডলারের কাছাকাছি দামও দেখা গিয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার ঠিক উল্টো ছবিটা দেখা গেল ভারতে তেল আমদানির ক্ষেত্রে। সমস্ত শঙ্কাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেপ্টেম্বরে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি ২০২৬ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক তথ্য সংস্থা ‘কেপলার’ (Kpler)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই মাসে ভারতের মোট আমদানির পরিমাণ ছিল প্রতিদিন প্রায় ৫.২৬ মিলিয়ন ব্যারেল। এর পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে সরবরাহ বৃদ্ধি।
রেকর্ড আমদানির নেপথ্যে কারা?
ভারতের তেলের জোগানে রাশিয়া দীর্ঘকাল ধরে বড় ভূমিকা পালন করে আসছে এবং এখনো তারা শীর্ষস্থানে রয়েছে। তবে সেপ্টেম্বর মাসে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের আমদানি তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, ওমান এবং কাতার—এই দেশগুলি মিলিয়ে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৩৯ শতাংশ জুগিয়েছে।
ইরাক ও সৌদি আরব: এ মাসে ইরাক থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫.২৫ লক্ষ ব্যারেল এবং সৌদি আরব থেকে প্রায় ৫.১৭ লক্ষ ব্যারেল তেল এসেছে ভারতে।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও কুয়েত: সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে এসেছে প্রায় ৪.৩৮ লক্ষ ব্যারেল। পাশাপাশি, কুয়েতও তাদের সরবরাহ বাড়িয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩.৩৫ লক্ষ ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে।
অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালী নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এত উৎকণ্ঠার পরেও উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে ভারতের বাজারে নিয়মিত তেল পৌঁছেছে, যা দেশের শোধনাগারগুলির কার্যক্রম সচল রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে কি রাশিয়ার তেল আমদানি কমেছে?
হ্যাঁ, সেপ্টেম্বর মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানির পরিমাণ আগের তুলনায় কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও রাশিয়া এখনও ভারতের সবচেয়ে বড় একক তেল সরবরাহকারী দেশ হিসেবেই বজায় রয়েছে।
কেপলারের তথ্য জানাচ্ছে, সেপ্টেম্বরে রাশিয়া থেকে ভারতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১.৭৪ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এসেছে। আর অন্যদিকে, ইরাক এই মাসে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করেছে। এর আগে গত কয়েক মাস ধরে পশ্চিম এশিয়া থেকে তেলের সরবরাহে নানা বাধা তৈরি হলেও সেপ্টেম্বরে সেই পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি ঘটেছে। ইরাক, সৌদি আরব ও কুয়েতের মতো দেশগুলি থেকে আমদানি বাড়ায় ভারতের জ্বালানি ঝুড়িতে পশ্চিম এশিয়ার অংশীদারিত্ব ফের বাড়তে শুরু করেছে।
হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে কীভাবে আসছে তেল?
এই পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে কৌতূহলপূর্ণ দিক হলো—এত ঝুঁকির মধ্যেও হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে তেল আসছে কীভাবে? সাম্প্রতিক বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, এই জটিলতা এড়াতে তেল সরবরাহকারীরা অভিনব বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছেন।
এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো ‘শিপ-টু-শিপ’ বা এসটিএস (Ship-to-Ship) ট্রান্সফার। এই ব্যবস্থায় মাঝসমুদ্রে একটি জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। এর ফলে হরমুজের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট এড়িয়ে উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে ভারতের মতো বড় ক্রেতাদের কাছে নিরাপদে তেল পৌঁছে যাওয়ার পথ অনেকাংশেই সচল রাখা সম্ভব হয়েছে।