শিক্ষিকা নেই, ভরসা কেবল গ্রুপ-ডি কর্মী! মন্ত্রীর গ্রামের স্কুলের এই ভয়ঙ্কর ছবি দেখেও কি টনক নড়বে প্রশাসনের?

বাংলার জঙ্গলমহলের শিক্ষা ব্যবস্থার এক চরম ও মর্মান্তিক বাস্তব চিত্র সামনে এল। খোদ রাজ্যের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডুর নিজের এলাকা বাঁকুড়ার জঙ্গলঘেরা প্রত্যন্ত গ্রাম ভূলাগাড়ার একটি জুনিয়ার হাইস্কুলে গত দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে নেই কোনো অঙ্কের শিক্ষক। ফলস্বরূপ, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা পড়ুয়াদের কপালে জোটে না একটিও অঙ্কের ক্লাস। প্রতিকূল পরিকাঠামো এবং উপযুক্ত শিক্ষকের অভাবে জঙ্গলমহলের এই বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
বাঁকুড়ার বারিকুল থানার অধীনস্থ বাগডুবি, ভূলাগাড়া, সিন্দ্রিয়াম সহ একাধিক জঙ্গলঘেরা গ্রাম একসময়ে মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এই অঞ্চলের শিক্ষা এবং পরিকাঠামোর হাল যে তিমিরে ছিল, সে তিমিরেই রয়ে গেছে। সম্প্রতি এই এলাকারই বাসিন্দা ক্ষুদিরাম টুডু রাজ্যের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেলেও তাঁর নিজের গ্রামের ভূলাগাড়া জুনিয়ার হাইস্কুলের দুর্দিন কাটেনি। এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে মাত্র ৩ জন শিক্ষিকা রয়েছেন, যাঁরা কোনোমতে একে অপরকে সাহায্য করে ক্লাস সামলান। ইতিহাসের শিক্ষিকাকে বাধ্য হয়ে ভূগোলের ক্লাস নিতে হয়, ইংরেজির শিক্ষিকাকে সামলাতে হয় বিজ্ঞান, আর বাংলার শিক্ষিকা কখনো বাংলা তো কখনো বিজ্ঞান ও ভূগোল পড়ান। কিন্তু অঙ্কের ক্লাস নেওয়ার মতো কোনো শিক্ষক না থাকায় বাধ্য হয়ে স্কুলের গ্রুপ-ডি কর্মী ফাঁকা সময়ে কদাচিৎ পঞ্চম শ্রেণির বাচ্চাদের অঙ্ক দেখিয়ে দেন। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গত ১৬ বছরে একদিনও স্কুলের খাতায় অঙ্কের ক্লাস পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেনি।
এই স্কুলের বেশিরভাগ পড়ুয়াই তাঁদের পরিবারের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। ফলে বাড়িতে অঙ্ক শেখানোর বা বোঝানোর মতো কেউ নেই। জঙ্গলমহলের অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে প্রাইভেট টিউশনি নেওয়ার সামর্থ্যও নেই। অন্যদিকে, গ্রামের আশেপাশে কোনো হাই বা জুনিয়র হাইস্কুল না থাকায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ৭ থেকে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ পাহাড় ও জঙ্গল ঘেরা দুর্গম পথ পেরিয়ে বারিকুল, ছেঁদাপাথর বা রানিবাঁধের স্কুলে পাঠাতে গিয়ে অভিভাবকরা নিরাপত্তা হীনতায় ভোগেন। ফলে গোঁজামিল দিয়ে কোনোমতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উত্তীর্ণ হলেও প্রবল অঙ্কভীতি এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকায় একটা বড় অংশের পড়ুয়া স্কুলছুট হয়ে পড়ছে। এদের মধ্যে কেউ বাধ্য হয়ে ঘরের রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির কাজে জড়িয়ে পড়ছে, আবার কেউ কিশোর বয়সেই পেটের টানে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে পাড়ি দিচ্ছে। ডাক্তার বা শিক্ষক হওয়ার যে রঙিন স্বপ্ন মামনি, সঙ্গীতা ও শুভদ্রাদের চোখে ছিল, তা আজ অঙ্ক না শেখার নির্মম অভিশাপে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে।
স্কুলের পড়ুয়া থেকে শুরু করে শিক্ষক-শিক্ষিকারা সকলেই অবিলম্বে স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, রাজ্যের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু এই শোচনীয় অবস্থার জন্য বিগত সরকারকেই নিশানা করেছেন এবং দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে জঙ্গলমহলের এই স্কুলের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। এখন দেখার, কবে অন্ধকার দূর করে এই পড়ুয়াদের জীবনে শিক্ষার আলো ফোটে।