অনলাইন জুয়ায় বিশাল কেলেঙ্কারি! ‘রামি কালচার’-এর ৪৪২ কোটি টাকার সম্পত্তি ক্রোক করল ইডি

অনলাইন গেমিং ও বেটিং অ্যাপের বিরুদ্ধে আরও এক বড়সড় পদক্ষেপ করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। জনপ্রিয় অনলাইন রামি গেমিং অ্যাপ ‘রামি কালচার’ এবং তার সহযোগী সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিয়ে প্রায় ৪৪২.৩৫ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর জারি করা একটি অস্থায়ী বাজেয়াপ্তি আদেশের ভিত্তিতে এই মেগা অভিযান চালানো হয়েছে।

কী রয়েছে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির তালিকায়?

ইডি সূত্রে জানা গেছে, এই বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু ফিক্সড ডিপোজিট (FD), বাণিজ্যিক দোকান, একটি বিলাসবহুল ভিলা এবং একাধিক আবাসিক সম্পত্তি। গেমস্ক্র্যাফট টেকনোলজিস প্রাইভেট লিমিটেডের শেয়ারহোল্ডারদের পরিবারের সদস্য, ব্যক্তিগত পারিবারিক ট্রাস্ট এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানির নামে এই সম্পত্তিগুলি নথিভুক্ত ছিল।

৩ কোটি ব্যবহারকারী ও নিষিদ্ধ রাজ্যেও কারবার

তদন্তে উঠে এসেছে যে, গেমস্ক্র্যাফট টেকনোলজিস এবং রামিটাইম টেকনোলজিস মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে রামিকালচার, রামিপ্রাইম, প্লেশিপ এবং রামিটাইমের মতো বিভিন্ন ব্র্যান্ড চালিয়ে আসল টাকার জুয়া খেলা পরিচালনা করত। দেশজুড়ে এই প্ল্যাটফর্মগুলির প্রায় ৩ কোটি ব্যবহারকারী ছিল। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যে বসবাস করতেন, যেখানে অনলাইন আসল টাকার জুয়া বা বেটিং আইনত নিষিদ্ধ। এই অ্যাপগুলি ব্যবহারকারীদের করা বাজির ওপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্ল্যাটফর্ম কমিশন কাটত।

বট (Bot) ব্যবহারের মারাত্মক জালিয়াতি

ইডি-র তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, কোম্পানিগুলি ব্যবহারকারীদের বলত তাদের গেমিং প্ল্যাটফর্ম সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ন্যায্য। কিন্তু পর্দার আড়ালে ব্যবহার করা হতো ‘বট’ অর্থাৎ বিশেষ কম্পিউটার প্রোগ্রাম ও অ্যালগরিদম। ব্যবহারকারীরা ঘুণাক্ষরেও টের পেতেন না যে তারা আসল মানুষের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Bot) বিরুদ্ধে খেলছেন। এর ফলে সাধারণ খেলোয়াড়রা নিয়মিত সর্বস্বান্ত হতেন এবং কোম্পানিগুলি অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিত।

বিজ্ঞাপন ও প্রলোভনের ফাঁদ

নতুন ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে এই কোম্পানিগুলি মার্কেটিং ও প্রচারের পেছনে প্রায় ১,০৩৫ কোটি টাকা উড়িয়েছিল। ক্যাশ বোনাস, রেফারেল ইনসেনটিভ এবং ফ্রি টুর্নামেন্টের লোভ দেখিয়ে মানুষকে আরও বেশি টাকা জমা দিতে বাধ্য করা হতো। এমনকি যারা বড় ধরনের লোকসান গুটিয়ে খেলা ছেড়ে চলে যেতেন, তাঁদেরও এসএসএস নোটিফিকেশন, টেলিমার্কেটিং কল ও নানা প্রচারমূলক অফারের মাধ্যমে আবার জুয়ার নেশায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাত এই চক্র।

এ পর্যন্ত প্রায় ২৮৪৩ কোটি টাকার কড়া পদক্ষেপ

তদন্তে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, অপরাধমূলক উপায়ে অর্জিত এই সমস্ত কালো টাকা পরবর্তীতে লভ্যাংশ ও শেয়ার পুনঃক্রয়ের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এরপর সেই অর্থ মিউচুয়াল ফান্ড, বন্ড, সোনা-হীরা এবং দামী সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করা হয়।

এর আগের তল্লাশি অভিযানগুলিতেও ৪৯৫ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পত্তি, নগদ অর্থ এবং প্রায় ২.৩০ কেজি সোনা ও হীরা জব্দ করেছিল ইডি। সব মিলিয়ে এই জালিয়াতি মামলার সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২,৮৪৩ কোটি টাকার বেআইনি উপার্জন বাজেয়াপ্ত বা ক্রোক করা হয়েছে। অনলাইন বেটিংয়ের এই বিশাল জালিয়াত চক্রের শেকড় কতদূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখতে ইডির তদন্ত বর্তমানে জারি রয়েছে।