জেলে ভালো খাবার ও থাকার জন্য প্রতি মাসে দিতে হয় হাজার হাজার টাকা! নজিরবিহীন অভিযোগে তোলপাড় রাজ্য

রাজ্যের সংশোধনাগারগুলিতে বন্দিদশাকে ঘিরে এক ভয়ঙ্কর ও নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এল, যা নিয়ে এই মুহূর্তে গোটা আইনি ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। জেলখানার ভেতর একটু ভালো খাবার খাওয়া, তুলনামূলকভাবে ভালো জায়গায় ঘুমানো কিংবা সাধারণ কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য নাকি কয়েদিপিছু প্রতি মাসে সাত হাজার থেকে পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত তোলা আদায় করা হয়। ভাবা যায়! জেলখানার মতো একটি সুরক্ষিত ও শৃঙ্খলিত সরকারি পরিসরে কীভাবে এই ধরনের বেআইনি কারবার চলতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। ইতিমধ্যেই এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়টিকে সামনে রেখে কলকাতা হাইকোর্টের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটির গুরুত্ব বিচার করে রাজ্যের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিচারপতি ঋতব্রত কুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ।
তদন্তে উঠে আসা প্রাথমিক তথ্যে জানা গিয়েছে, জেলের ভেতরে এই বিশেষ পরিষেবা বা সুযোগ-সুবিধা টিকিয়ে রাখার জন্য যে বিপুল পরিমাণ টাকা তোলা হয়, তার প্রায় ষাট থেকে সত্তর শতাংশ টাকাই প্রত্যক্ষভাবে কয়েদিদের নিজেদেরই বহন করতে হয়। শুধু তাই নয়, এই সমস্ত অবৈধ লেনদেন বা পরিষেবার মূল্য পরিশোধ করতে হয় সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমে বা অনলাইনে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যের সমস্ত জেলের এই দুর্নীতির লেনদেন সংক্রান্ত একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট আদালতে পেশ করার কড়া নির্দেশ দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ। বিশেষ করে বালুরঘাট জেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতি মাসে সুপরিকল্পিত উপায়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লক্ষ টাকার একটি সিস্টেমেটিক তোলাবাজির মারাত্মক অভিযোগ সামনে এসেছে, যা জেলের অন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এই সমগ্র ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল আইনজীবী তৌহিদ ইসলামের একটি সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে। ২০২৩ সালের মে ও জুন মাসের মাঝে দীর্ঘ সাতাশ দিন আইনি তদন্তের স্বার্থে জেল হেফাজতে কাটাতে হয়েছিল তৌহিদ ইসলামকে। জেলখানার ভেতর কাটানো সেই দিনগুলিতে তিনি নিজের চোখে কয়েদিদের ওপর চলা দুর্নীতি, শোষণ এবং এই জঘন্য তোলাবাজির বিভিন্ন দিক চাক্ষুষ করেছিলেন। জেল থেকে বাইরে আসার পর রাজ্যজুড়ে কারাগারগুলির এই কাঠামোগত ও সিস্টেমেটিক তোলাবাজির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন। রাজ্যজুড়ে জেলের এই রমরমা দুর্নীতি চিরতরে বন্ধ করতে তিনি সিবিআই (CBI), সিআইডি (CID) কিংবা ইডি (ED)-র মতো কেন্দ্রীয় বা স্বাধীন সংস্থাকে দিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের জোরালো আর্জি জানান।
উল্লেখ্য, অতীতেও জেলখানার ভেতর থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার একাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। গত বছর জেলবন্দি থাকা অবস্থাতেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তোলাবাজি চালানোর মারাত্মক অভিযোগ উঠেছিল বড়ঞার তৎকালীন বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহার বিরুদ্ধে। সেই সময় এই গুরুতর অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, যিনি তাঁর দাবির সপক্ষে প্রামাণ্য তথ্য ও নথিও পেশ করেছিলেন। এছাড়া কিছুদিন আগেই কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলের ভেতর থেকে জঙ্গি আফতাব আনসারির কাছে একটি আইফোন এবং ওয়াইফাই রাউটারসহ একাধিক অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় রাজ্য জুড়ে হুলুস্থুল পড়ে গিয়েছিল। বারবার এই ধরনের হাই-প্রোফাইল ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করছে যে, রাজ্যের কারাগারগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা ঢিলেঢালা এবং এর অন্তরালে এক গভীর দুর্নীতির জাল বিছিয়ে রয়েছে। আগামী দিনে আদালতের তলব করা রিপোর্টের পর এই দুর্নীতির নেপথ্যে থাকা আসল কুশীলবদের মুখ উন্মোচন হবে কি না, এখন সেটাই দেখার।