বোম্বে হাইকোর্টের কড়া নির্দেশেই কি মিলবে সুবিচার? দিশাকাণ্ডে নতুন করে নড়েচড়ে বসল সিবিআই!

প্রয়াত এবং প্রতিভাবান বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের প্রাক্তন ম্যানেজার দিশা সালিয়ানের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় অবশেষে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি মোড় এল। ঘটনার প্রায় দীর্ঘ ছ’বছর পর এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তে নেমে আনুষ্ঠানিকভাবে এফআইআর (FIR) দায়ের করল দেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)। এর আগে মুম্বই পুলিশের তদন্ত পদ্ধতি ও ভূমিকা নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল। পরবর্তীতে বম্বে হাইকোর্টের অত্যন্ত কড়া নির্দেশ এবং আদালতের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণের পরই কেন্দ্রীয় সংস্থা এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ৮ জুন গভীর রাতে। ওই দিন মুম্বইয়ের জনবহুল মালাড এলাকার একটি বহুতল আবাসনের বারো তলা থেকে পড়ে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় দিশা সালিয়ানের। সেই সময় মুম্বই পুলিশ পুরো ঘটনাটিকে একটি সাধারণ ‘দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু’ অর্থাৎ অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ রিপোর্ট বা এডিআর হিসেবে নথিভুক্ত করেছিল এবং খুব দ্রুত মামলার ফাইল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে আদালতে একটি ক্লোজার রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। কিন্তু মৃত দিশার বাবা মুম্বই পুলিশের এই একপেশে ও দায়সারা তদন্তে বিন্দুমাত্র সন্তুষ্ট হতে পারেননি। পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়ায় একাধিক ভয়ংকর গাফিলতি এবং স্পষ্ট অসংগতির অভিযোগ তুলে তিনি নিরপেক্ষ সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়ে সরাসরি বম্বে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।
মামলার দীর্ঘ শুনানির সময় বম্বে হাইকোর্ট মুম্বই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে। আদালত অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানায় যে, একটি অত্যন্ত রহস্যজনক মৃত্যুকে কীভাবে দিনের পর দিন দীর্ঘ ছ’বছর ধরে শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া হলো, তা সত্যিই অত্যন্ত বিস্ময়কর। পুলিশের সামগ্রিক তদন্ত প্রক্রিয়ায় বহু স্পষ্ট গরমিল রয়েছে উল্লেখ করে আদালত কঠোর পর্যবেক্ষণ করে যে, এই তদন্ত কোনো সঠিক সমাধান দেওয়ার বদলে নতুন নতুন ধোঁয়াশা ও প্রশ্ন তৈরি করছে। এরপরই এই পুরো ঘটনার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য মামলার দায়িত্ব সরাসরি সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়ার ঐতিহাসিক নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত।
উল্লেখ্য, দিশা সালিয়ানের রহস্যজনক মৃত্যুর ঠিক ছ’দিন পর, অর্থাৎ ২০২০ সালের ১৪ জুন নিজের সুসজ্জিত ফ্ল্যাট থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় জনপ্রিয় অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের নিথর দেহ। অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে পেশাগতভাবে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত দুই ব্যক্তির এই পরপর মৃত্যুর ঘটনা গোটা দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। সেই সময় এই দুটি মৃত্যুর মধ্যে গভীর কোনো গোপন যোগসূত্র রয়েছে কি না, এটি শুধুই দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা, নাকি এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে কোনো প্রভাবশালী মহলের গভীর ষড়যন্ত্র—তা নিয়ে জনমানসে তৈরি হয়েছিল হাজারো জল্পনা।
পরবর্তীতে মহারাষ্ট্র সরকারের বিশেষ নির্দেশে অভিনেতা সুশান্তের মৃত্যুর তদন্তভারও সিবিআই-এর হাতে অর্পণ করা হয়েছিল। সেই মামলায় সিবিআই তদন্ত শেষ করে আদালতে ক্লোজার রিপোর্ট জমা দিয়ে জানিয়েছিল যে, সুশান্ত সিং রাজপুত আত্মহত্যাই করেছিলেন। যদিও সিবিআই-এর সেই রিপোর্টটি এখনও সংশ্লিষ্ট আদালতের চূড়ান্ত বিবেচনার অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে এখন দীর্ঘ ছয় বছর বাদে দিশার মৃত্যুর ঘটনায় সিবিআই নতুন করে এফআইআর দায়ের করায় মামলার থমকে যাওয়া তদন্তের চাকা নতুন গতিতে ঘুরতে শুরু করেছে। এতদিন ধরে ধামাচাপা পড়ে থাকা বা লুকিয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রমাণগুলো এবার একে একে আলোর মুখ দেখবে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। দীর্ঘ ছয় বছর দীর্ঘসূত্রিতার পর সিবিআই-এর এই নবপর্যায়ের সক্রিয়তা কি তবে শেষ পর্যন্ত দিশা সালিয়ানের মৃত্যুর আসল ও নেপথ্যের রহস্য উন্মোচন করতে পারবে? এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় পুরো দেশ।