তেলের ভাণ্ডারে টান! সৌদির এই গোপন পাইপলাইন বন্ধ হতেই কি বিশ্বজুড়ে শুরু হতে চলেছে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট?

সৌদি আরবের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত তেলের পাইপলাইন হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে এক বিশাল অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা ঘনীভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত এই প্রধান পাইপলাইনটি দ্রুত সচল করা না হলে, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই সৌদি আরবের রপ্তানিযোগ্য তেলের ভান্ডার সম্পূর্ণ ফুরিয়ে যেতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের জোগানে প্রায় চার শতাংশ ঘাটতি দেখা দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে রেকর্ড ছুঁয়ে থাকা জ্বালানির লাগামছাড়া দামকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
খবর অনুযায়ী, গত শুক্রবার এক আকস্মিক ড্রোন হামলার মুখে পড়ে সৌদি আরব তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করতে বাধ্য হয়। তবে এই হামলায় ঠিক কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিংবা কবে নাগাদ পাইপলাইনটি আবার আগের মতো সচল করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে রিয়াদ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত বা স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বিগত প্রায় ছয় মাস ধরে সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব বিকল্প পথ হিসেবে এই পাইপলাইনটিকেই প্রধান ভরসা হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। আরব উপদ্বীপের ওপর দিয়ে বিস্তৃত এই পাইপলাইনটি সরাসরি লোহিত সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক এই দেশটি এই বিকল্প পাইপলাইনটির ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন নিয়মিত প্রায় ৪০ লক্ষ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে প্রেরণ করত, যা বিশ্বব্যাপী মোট জ্বালানি জোগানের প্রায় চার শতাংশের সমান। কিন্তু বর্তমানে পাইপলাইনটি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় ইয়ানবু বন্দরে যে পরিমাণ তেল মজুত রয়েছে, তা দিয়ে বড়জোর আগামী পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব। সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত নির্ভরযোগ্য তিনটি পৃথক সূত্র এই আশঙ্কার কথা নিশ্চিত করেছে। এর পাশাপাশি চতুর্থ আরেকটি সূত্র জানিয়েছে যে, মিশরের আইন সুখনা এবং সিদি কেরির বন্দরেও সৌদি আরবের কিছু নির্দিষ্ট তেলের ভাণ্ডার মজুত রয়েছে, যা দিয়ে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের আরও কিছুদিন কোনোমতে জোগান দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
শিল্পক্ষেত্রের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ইয়ানবু বন্দরের মোট মজুত ধারণক্ষমতা প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ব্যারেল। অন্যদিকে, আইন সুখনা এবং সিদি কেরির বন্দরে যথাক্রমে ১৮ মিলিয়ন ও ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সংরক্ষণ করার ক্ষমতা রয়েছে। তবে রয়টার্সের হাতে আসা গোপন সূত্র মারফত জানা গেছে যে, এই সমস্ত রিজার্ভ ভান্ডারগুলির কোনোটিই বর্তমানে সম্পূর্ণ ভর্তি নেই। ফলে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটি যত দ্রুত সম্ভব পুনরায় সচল করা না হলে এই সীমিত তেলও খুব শীঘ্রই ফুরিয়ে যাবে। ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনটি মেরামত করতে ঠিক কতদিন সময় লাগবে, তা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রের ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া গেছে। একটি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সম্পূর্ণ কাজ শেষ হতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে অন্য একটি সূত্রের মতে, মেরামতের কাজ চলাকালীনই যদি আংশিকভাবে পাম্পিং প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হয়, তবে পাইপলাইনটি কিছুটা দ্রুত চালু করা যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা IEA শুক্রবার এক বিশেষ বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগর উভয় পথেই জ্বালানির জোগান নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ায় সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসে সৌদি আরবের সামগ্রিক তেল সরবরাহ গত তিন দশকের মধ্যে একেবারে সর্বনিম্ন স্তরে এসে ঠেকেছে। IEA-র তীব্র আশঙ্কা, চলতি বছরে বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক জ্বালানি তেলের জোগান প্রতিদিন প্রায় ৫৭ লক্ষ ব্যারেল বা প্রায় ছয় শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। উল্লেখ্য, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা যারা বহুদিন ধরেই সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও তেলবাহী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়ে আসছিল, তারা সম্প্রতি লোহিত সাগরের মুখে কৌশলগতভাবে একটি দ্বীপ দখল করে নেওয়ার পর গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
উল্লেখ্য, এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হতো। কিন্তু শিল্পক্ষেত্রের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী মাধ্যমেই সেই সরবরাহ নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৬ থেকে ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে এসে দাঁড়িয়েছে। বিগত সপ্তাহে সৌদি আরব ওপেক (OPEC)-কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল যে, যুদ্ধের আগের গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যেখানে তাদের দৈনিক তেল উৎপাদন ছিল প্রায় ১০.৯ মিলিয়ন ব্যারেল, বর্তমান বছরের আগস্ট মাসে তা ভয়াবহভাবে কমে মাত্র ৬.২ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।