ভারত-মোহ কাটাতে হবে ঢাকাকে! হাসিনা জমানার ‘অস্বস্তি’ ভুলে এবার দিল্লির সঙ্গে কোন বড় খেলায় নামছে বাংলাদেশ?

শেখ হাসিনা জমানার দীর্ঘ ১৫ বছরের টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক পালাবদলের পর এবার ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে সাজাতে চাইছে বাংলাদেশ। অতীতের সমস্ত অস্বস্তি ও রাজনৈতিক সমীকরণ পেছনে ফেলে দিল্লির সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক ‘রিসেট’ করার জোরালো বার্তা দিল ঢাকা।

সম্প্রতি ঢাকায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হল ভারতের সঙ্গে একটি ইতিবাচক, কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। তবে এই কূটনীতি কোনো বহুপাক্ষিক মঞ্চের মাধ্যমে পরিচালিত হবে না, বরং দুই দেশের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই সমস্ত জটিলতার সমাধান করা হবে। হাসিনা জমানার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন যে বিগত দেড় দশক ধরে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল যথেষ্ট অস্বস্তিকর ও আচ্ছন্নতায় ভরা। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সেই অন্ধকার অধ্যায় থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসে একটি বাস্তবসম্মত বৈদেশিক নীতির পথে হাঁটতে চায়।

প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের মতে, বাংলাদেশকে এবার ‘ভারত-মোহ’ বা অতিরিক্ত আচ্ছন্নতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্ব স্বীকার করেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, ভারতকে নিয়ে ২৪ ঘণ্টা চিন্তা না করে দেশের সার্বিক জাতীয় স্বার্থকেই বিদেশনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু বানাতে হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানো হচ্ছে; বরং প্রতিবেশী ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দিল্লির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই চলা হবে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে বেশ কিছু স্পর্শকাতর ও অমীমাংসিত ইস্যু মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি নিয়ে দুই প্রশাসনের মধ্যে মতপার্থক্য এখনও বজায় রয়েছে। এর পাশাপাশি সীমান্ত পারাপারে গুলি ও মৃত্যুর ঘটনা, অবৈধ পুশ-ইন সমস্যা, তিস্তা ও গঙ্গার মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলির জলবণ্টন চুক্তি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং ভিসা পরিষেবা চালুর মতো একাধিক জটিল বিষয় বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কের বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ‘রিসেট’ করার কথা ঘোষণা করা হলেও রাতারাতি সমস্ত সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব নয়। বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অবিশ্বাস কাটাতে হলে দুই দেশকে ধাপে ধাপে আস্থা অর্জনের প্রক্রিয়াতেই এগোতে হবে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তা সত্ত্বেও দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার সার্বভৌম সমতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সুবিধা বাড়ানোর পক্ষে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। ভৌগোলিক অবস্থান, অভিন্ন সীমান্ত, নিরাপত্তা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধন—সব মিলিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক। এখন দেখার বিষয়, ঢাকার এই নতুন ‘রিসেট’ বার্তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে কতটা দীর্ঘস্থায়ী বরফ গলাতে পারে।