প্রযুক্তির ‘অস্ত্রীকরণ’ রুখতে হবে! ব্রিকস মঞ্চ থেকে চিনকে কড়া বার্তা দিয়ে বিশ্বকে বড় হুশিয়ারি মোদীর

চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেই ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ থেকে সরাসরি চিনের দিকে ইঙ্গিত করে প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ‘অস্ত্রীকরণ’ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। চিনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সরাসরি উপস্থিতি ও বিশ্বনেতাদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সম্পদ এবং প্রযুক্তিকে যদি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অস্ত্র বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে তা বিশ্ববাসীর যৌথ উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এক ভয়ঙ্কর এবং স্থায়ী বাধা হয়ে দাঁড়াবে। অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক এই টানাপোড়েনের আবহে মোদীর এই দূরদর্শী ও কড়া বার্তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিরাট মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
রবিবার ব্রিকস সম্মেলনের অন্তিম দফার ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বর্তমান পরস্পর-নির্ভরশীল বিশ্বের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন যে, আজকের দিনে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে তৈরি হওয়া সংকট আর ভৌগোলিক সীমানার গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকে না। সাম্প্রতিক অতীতে ঘটে যাওয়া বিশ্বব্যাপী মহামারি, আকস্মিক জলবায়ু বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড়সড় বিঘ্ন ঘটার ঘটনাগুলি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে যে কোনো একটি দেশের সংকট আজ সমগ্র বিশ্বকে বিপর্যস্ত করতে পারে। এই ধরনের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য ব্রিকসভুক্ত দেশগুলিকে আরও অনেক বেশি মাত্রায় সতর্ক থাকতে হবে, সময়মতো সঠিক পদক্ষেপের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হবে এবং যেকোনো সংকট ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত যৌথ কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
ভবিষ্যতের যেকোনো সম্ভাব্য মহামারি বা স্বাস্থ্য সংকট এড়াতে বৈঠকে একটি যুগান্তকারী ঐকমত্যের কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান যে, সংক্রামক রোগ ও মহামারির বিস্তার রোধ করতে এবং সঠিক সময়ে বিপদ সংকেত পেতে একটি ‘ব্রিকস ইন্টিগ্রেটেড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ বা সমন্বিত প্রাক-সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে সমস্ত সদস্য রাষ্ট্র একমত হয়েছে। এর পাশপাশি, সুসংহত উপায়ে তথ্য আদান-প্রদান এবং জরুরি নির্দেশিকা তৈরি করার কাজও সম্পন্ন হয়েছে, যা আগামী দিনে বিশ্ববাসীকে রক্ষা করতে বড় ভূমিকা নেবে। পাশাপাশি, বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি স্থিতিশীল রাখতে ‘ব্রিকস লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন কোঅপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ চালু করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে অর্থনৈতিক ধাক্কা লাগলেও অন্য দেশগুলোর সাপ্লাই চেইন সুরক্ষিত থাকে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত না হয়।
উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ সংস্কৃতির প্রসারে প্রধানমন্ত্রী ‘ব্রিকস ইনকিউবেটর নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার প্রস্তাব জোরালোভাবে পেশ করেছেন। তাঁর মতে, এই নেটওয়ার্কটি সদস্য দেশগুলির উদীয়মান স্টার্টআপ এবং ইনকিউবেটরগুলিকে একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করবে, যার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি, মেধা এবং অভিনব ব্যবসায়িক ভাবনাগুলি দ্রুত আদান-প্রদান করা সম্ভব হবে। ভারত নিজের সভাপতিত্বের পুরো সময়জুড়ে মূলত চারটি মূল স্তম্ভ—সহনশীলতা (Resilience), উদ্ভাবন (Innovation), সহযোগিতা (Cooperation) এবং স্থায়িত্ব (Sustainability)—কে সামনে রেখেই সমস্ত কাজ পরিচালনা করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পরিশেষে, বিশ্বজুড়ে অবহেলিত ও প্রান্তিক গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিরা যাতে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল টেবিলে নিজেদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পায়, সেই জোরাलो দাবিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।