দুর্গাপূজায় আমিষ খাওয়া নিয়ে চরম বিতর্ক! ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্যে কেন তোলপাড় বাংলা?

বাঙালি সমাজ, সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মাছের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। অতীতে কলকাতার এক বিয়ের অনুষ্ঠানে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে বাঙালি সংস্কৃতিতে আমিষ খাবারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বৈষ্ণব পরিবারের এক সদস্যকে মাছের চপ বা লাউয়ের পাকোড়া খাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি মজা করে বলেছিলেন, এই সংস্কৃতিতে নিরামিষ চাপিয়ে দিলে বাঙালি আর বাঙালি থাকবে না, মারোয়াড়ি হয়ে যাবে। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, বিহারের মৈথিলী অঞ্চল, অসম ও ওড়িশায় শাক্ত, বৈষ্ণব বা শৈব নির্বিশেষে মাছ একটি প্রধান খাদ্য।

বৈদিক দর্শন বা বৈষ্ণব ধর্মের উত্থানের আগে থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে শাক্ত সম্প্রদায়ের ব্যাপক প্রচলন ছিল। শাক্ত মতে, শিব হলেন শান্ত ও নিষ্ক্রিয় পুরুষ সত্তা, আর দেবী শক্তি হলেন সক্রিয় ও সৃজনশীল প্রকৃতি। এই সম্প্রদায়ের দেবী আরাধনায় সৌম্য ও উগ্র—উভয় রূপের প্রকাশ দেখা যায়। বামাচারে দেবীর পুজোয় বলিদান এবং আমিষ ভক্ষণের প্রচলন রয়েছে। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে শাক্ত সংস্কৃতির শক্তিশালী প্রভাব থাকায় বাংলায় দুর্গাপূজার সময় ব্যাপকভাবে আমিষ খাবার খাওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, যা উত্তর ভারতের নবরাত্রির সম্পূর্ণ উল্টো। উত্তর ভারতে যখন মানুষ নিরামিষ উপবাস পালন করেন, তখন বাংলায় এটি উদযাপনের সর্বজনীন উৎসব।

কলকাতার ভৌগোলিক গঠন এবং প্রচুর পুকুরের উপস্থিতি বাঙালি জীবনে মাছের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলার গ্রামীণ ও শহুরে জীবনে ধান ও মাছ পরস্পরের পরিপূরক। ধান থেকে শর্করা এবং মাছে প্রচুর প্রোটিন থাকায় এটি বাংলার প্রধান খাদ্যে পরিণত হয়েছে। বর্ষার আধিক্যের কারণে অতীতে আমিষের এই প্রাচুর্য বাঙালির খাদ্যতালিকার অন্যতম অঙ্গ হয়ে ওঠে।

ভারত একটি বৈচিত্র্যের দেশ। এখানকার প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব রীতিনীতি, উৎসব এবং খাদ্যাভ্যাস রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী দুর্গাপূজার সময় প্যান্ডেলে বা তার আশপাশে আমিষ খাবার খাওয়া নিয়ে মন্তব্য করায় দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর এই মন্তব্যকে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত এবং সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী বলে অভিহিত করেছে কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি। বাংলার শাসক দলও এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। পরবর্তীতে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী নিজের বক্তব্য স্পষ্ট করার চেষ্টা করলেও, বাঙালি সমাজে দুর্গাপূজা এবং আমিষের এই মেলবন্ধন হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই টিকে রয়েছে।