দিল্লিতে পিজি নিয়ে কড়া আইন! আর নয় জরাজীর্ণ ঘরে ঝুঁকি, ছাত্রছাত্রীদের সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ প্রশাসনের

দক্ষিণ দিল্লির সত্য নিকেতনে ৫০ বছরের পুরনো এক জরাজীর্ণ বহুতল আবাসন ভেঙে ৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর অবশেষে নড়েচড়ে বসল প্রশাসন। দিল্লি সরকারের তরফে শহরের হাজার হাজার বেআইনি ও অনিয়ন্ত্রিত পেয়িং গেস্ট বা পিজি আবাসনকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে ‘Paying Guest Accommodation Regulation and Welfare Bill’-এর প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। মুখার্জী নগর, লক্ষ্মী নগর, ওল্ড রাজেন্দ্র নগর এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নর্থ ও সাউথ ক্যাম্পাসের মতো প্রধান শিক্ষাসংক্রান্ত হাবগুলিতে এই নতুন নীতির অধীনে অত্যন্ত কড়াকড়ি শুরু হতে চলেছে। বারবার ঘটা অগ্নিকাণ্ড, যৌন হয়রানি এবং বিপজ্জনক পরিকাঠামোর মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলি রুখতেই রাজ্য সরকারের এই তড়িঘড়ি বিল আনার সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত এই খসড়া বিলে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে যে, দিল্লির সমস্ত পিজি আবাসনকে জোনিং অথরিটির থেকে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে লাইসেন্স গ্রহণ ও নথিভুক্তকরণ করতে হবে। এর জন্য পুলিশ, পুরসভা বা এমসিডি এবং স্থানীয় প্রশাসনের থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট বা এনওসি নেওয়া সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, প্রতিটি পিজি-কে একটি ইউনিক নম্বর বা পিজিআরএন প্রদান করা হবে এবং ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার জন্য সরকারের ‘GovPG’ নামের একটি বিশেষ সিঙ্গল-উইন্ডো ডিজিটাল পোর্টালে সমস্ত পিজির তালিকা ও সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হবে। এর ফলে পড়ুয়ারা ঘরে বসেই সমস্ত তথ্য যাচাই করে নিতে পারবেন।

ভাড়া ও ডিপোজিটের ক্ষেত্রে কড়া নিয়ম আনা হচ্ছে। পিজির মনগড়া ভাড়া বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত অগ্রিম বা ডিপোজিট নেওয়া রুখতে একটি নির্দিষ্ট ‘রেন্ট রেগুলেশন কমিটি’ গঠন করা হবে, যা অঞ্চলভিত্তিক ভাড়ার সীমা বা রেন্ট ব্যান্ড নির্ধারণ করে দেবে। নিয়মানুযায়ী, সর্বোচ্চ ৩ মাসের বেশি সিকিউরিটি ডিপোজিট বা অ্যাডভান্স ভাড়া নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, প্রতিটি পিজির প্রবেশপথ ও সাধারণ ব্যবহার্য এলাকাগুলিতে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং অন্তত ৩০ দিনের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করতে হবে। ১৫ জন বা তার বেশি শিক্ষার্থী থাকা পিজিগুলিতে রাতে নিরাপত্তা রক্ষী এবং ৫০০ মিটারের মধ্যে ওয়ার্ডেনের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুবিধার জন্য ‘GovPG’ পোর্টালের মাধ্যমে তাঁরা কোনও রকম নাম প্রকাশ না করেই সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন। এছাড়া প্রতিটি পিজির নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার ওপর ভিত্তি করে ‘কমপ্লায়েন্স রেটিং’ দেওয়া হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পুলিশ ও পুর আধিকারিকদের নিয়ে একটি ‘ইনস্টিটিউশনাল অ্যাকোমোডেশন কমিটি’ গঠন করা হবে, যা প্রতি তিন মাসে পিজিগুলি নিয়মিত পরিদর্শন করবে এবং যে কোনও বিরোধের নিষ্পত্তি করতে ১৫ দিনের সময়সীমা ধার্য করা হয়েছে। অন্যদিকে, যে সমস্ত পিজি মালিক অন্তত পরপর দুই বছর সমস্ত নিয়ম সঠিকভাবে মেনে চলবেন, তাঁদের সম্পত্তি কর বা প্রপার্টি ট্যাক্সে ছাড়, সহজে ঋণ প্রাপ্তি এবং “Certified Student-Friendly PG” বিশেষ তকমা দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি সত্য নিকেতনের পাঁচতলা পিজি ভেঙে পড়ে ৫ জন ছাত্রসহ মোট ৭ জনের করুণ মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় বাড়িওয়ালা হরিরাম গুপ্তা, তাঁর পরিবার এবং পিজি অপারেটর সহ মোট ৫ জনকে ইতিমধ্যেই পুলিশ গ্রেফতার করেছে। পাশাপাশি, পার্শ্ববর্তী ঝুঁকিপূর্ণ ও বেআইনি নির্মাণগুলি ভেঙে ফেলার কাজ শুরু করেছে পুরসভা। প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপে একদিকে যেমন পিজিতে বসবাসকারী ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে, তেমনই বেআইনিভাবে গজিয়ে ওঠা পিজিগুলির রমরমা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।