ডিএম-এর পকেট থেকে ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা! এনএসএ প্রয়োগে চরম শিক্ষা দিল হাইকোর্ট

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪ বছর বয়সী মেধাবী ছাত্র আন্দোলনকর্মী বঙ্গতনয়া আকৃতি চৌধুরীকে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ)-এর মতো কঠোর ধারায় আটক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন নয়ডার জেলাশাসক তথা দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের মেয়ে মেধা রূপম। তবে সেই নির্দেশকে সম্পূর্ণ বেআইনি, ভিত্তিহীন ও সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করে খারিজ করে দিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। শুধু তাই নয়, বিনা বিচারে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে ওই ছাত্রীকে কারাবন্দী করে রাখার মানসিক ও সামাজিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

এই চাঞ্চল্যকর মামলায় এলাহাবাদ হাইকোর্ট অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, এই শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণের টাকা কোনও সরকারি কোষাগার বা করদাতার তহবিল থেকে দেওয়া হবে না। বরং নয়ডার জেলাশাসক মেধা রূপম এবং এই বেআইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত অন্যান্য অভিযুক্ত আধিকারিকদের ব্যক্তিগত বেতন বা পকেট থেকেই কেটে তা আদায় করতে হবে। বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে আমলাদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার এই রায় এক যুগান্তকারী বার্তা দিল।

ঘটনার সূত্রপাত গত এপ্রিল মাসে। নয়ডায় স্থানীয় শ্রমিকদের একটি ন্যায্য আন্দোলনের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানাতে গিয়ে আকৃতি চৌধুরী গ্রেফতার হন। এরপর সাধারণ ফৌজদারি আইনের তোয়াক্কা না করে তাঁর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া এনএসএ প্রয়োগ করা হয় এবং তাঁকে দীর্ঘ পাঁচ মাস অন্ধকূপে আটকে রাখা হয়। গত ২ সেপ্টেম্বর এই মামলার দীর্ঘ শুনানির পর এলাহাবাদ হাইকোর্টের মাননীয় ডিভিশন বেঞ্চ জোরালো পর্যবেক্ষণ পেশ করে। আদালত জানায়, ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার যে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, তা এখানে চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ বা অপরাধের শক্তিশালী ভিত্তি ছাড়াই কেবল অন্ধ পুলিশি রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে এমন স্বৈরাচারী নির্দেশ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ দমন বা আইনের শাসনের বিকল্প হিসেবে এনএসএর এই ধরণের অপব্যবহারকে অত্যন্ত তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেছে উচ্চ আদালত।

নয়ডার জেলাশাসক মেধা রূপমের এই একরোখা ও কঠোর পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে ডিভিশন বেঞ্চ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে জানিয়েছে, “আমলা ও সরকারি কর্মচারীদের আনুগত্য সর্বদা দেশের সংবিধানের প্রতি থাকা উচিত, কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বা নেতার প্রতি নয়।” প্রশাসনিক আধিকারিকদের এই ধরণের স্বেচ্ছাচারী মানসিকতা উত্তরপ্রদেশ রাজ্যকে এক আশঙ্কাজনক ‘অরওয়েলিয়ান ডিস্টোপিয়া’ বা চরম প্রশাসনিক স্বৈরাচারের দিকে দ্রুত ঠেলে দিচ্ছে বলে অত্যন্ত কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট জেলাশাসক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিকদের মূল সার্ভিস রেকর্ডে আদালতের এই তীব্র অসন্তোষের কথা স্থায়ীভাবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা তাঁদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে বড় দাগ ফেলতে পারে।

উল্লেখ্য, যাঁর ব্যক্তিগত বেতন কেটে এই বিশাল অঙ্কের জরিমানা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেই নয়ডার ডিএম মেধা রূপম ২০১৪ ব্যাচের অত্যন্ত মেধাবী ও শীর্ষ আইএএস অফিসার এবং বর্তমান দেশের ২৬তম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা। ২০১৫ সালে নয়ডার প্রথম মহিলা জেলাশাসক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণকারী মেধা রূপমের বিরুদ্ধে স্বাধীন কণ্ঠস্বর রোধ ও আন্দোলন দমনের এই গুরুতর অভিযোগ এবং পরবর্তীতে হাইকোর্টের এই সাঁড়াশি আক্রমণ দেশের প্রশাসনিক ও আমলা মহলে বিশাল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। বিচারব্যবস্থার এই সাহসী পদক্ষেপ ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে বড় ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করছেন বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা।