সাতটি তাজা প্রাণ কেড়ে নিল বেআইনি হস্টেল! দিল্লির সত্য নিকেতন ভবন ধস কাণ্ডে এবার আসরে সুপ্রিম কোর্ট

রাজধানী দিল্লির বুকে ঘটে চলা অত্যন্ত মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় ফের একবার নড়েচড়ে বসল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। দিল্লির ব্যস্ত সত্য নিকেতন এলাকায় একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ার ভয়াবহ ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন সাতজন নিরীহ মানুষ এবং গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। এই লোমহর্ষক দুর্ঘটনার পরই দিল্লির সমস্ত পেয়িং গেস্ট (PG) এবং বেসরকারি হস্টেলগুলির সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে একযোগে বড় প্রশ্নচিহ্ন উঠে গিয়েছে। জনবহুল এই এলাকায় ছাত্রাবাসের নামে চলা অনিয়ম ও চরম গাফিলতির বিষয়টি এবার গড়ায় সোজা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক নিযুক্ত বিশেষ অ্যামিকাস কিউরি তথা বর্ষীয়ান আইনজীবী ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরে আদালতে একটি বিস্তারিত ও চাঞ্চল্যকর স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত ৬ সেপ্টেম্বর দুপুর নাগাদ। দিল্লির নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ক্যাম্পাসের অত্যন্ত কাছে অবস্থিত সত্য নিকেতনের ‘পি-১৪’ নামের চারতলা একটি ভবন হঠাৎই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বেসমেন্ট সমেত ওই পুরো ভবনটি ‘হোস্টেল ডেজ’ নামে ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য একটি পিজি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ ভবনটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়লে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় সাতজনের। খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল তৎপরতার সঙ্গে অন্তত বারো জন আহতকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এই মারাত্মক দুর্ঘটনার পর তদন্তে নেমে উঠে এসেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
আদালতে জমা পড়া ওই বিশেষ প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সত্য নিকেতনের মতো একটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ ছাত্রবহুল এলাকায় এই ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা আকস্মিক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এর পুনরাবৃত্তি দীর্ঘকালীন গাফিলতির ফল। ইতিপূর্বেও ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে এই এলাকাতেই আরেকটি ভবন ধসের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দুজন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং চারজন গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এই সমস্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, রাজধানীর বুকে নিয়মবহির্ভূতভাবে গড়ে ওঠা অবৈধ নির্মাণগুলি নিয়মিত পরিদর্শন করা, বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলি আগেভাগে চিহ্নিত করা এবং কঠোর নির্মাণ বিধিমালা বলবৎ করার প্রশাসনিক ব্যবস্থা কতটা দুর্বল ও নিষ্ক্রিয়।
এই চরম অব্যবস্থাপনার প্রতিকার করতে সুপ্রিম কোর্টের অ্যামিকাস কিউরি অজিত কুমার সিনহা দিল্লির সমস্ত কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে যত্রতত্র গড়ে ওঠা পিজি ও বেসরকারি হস্টেলগুলির দ্রুত ও বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং পরিদর্শনের জোরালো সুপারিশ করেছেন। আদালতের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে। সেখানে অ্যামিকাস কিউরি অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আর্জি জানাবেন। মূলত ভবনের ত্রুটিপূর্ণ নকশা, অনুমোদনহীন বেসমেন্ট নির্মাণ, যথেচ্ছ ভূমি ব্যবহার, অগ্নিকাণ্ড রোধের পরিকাঠামো এবং যাতায়াতের সংকীর্ণ প্রবেশপথের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা মাপকাঠিগুলি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যাচাই করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর ছাত্রছাত্রীদের প্রাণ সুরক্ষিত রাখতে এই আইনি পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার।