‘এমন কলকাতা আগে দেখিনি!’ উত্তম ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল নিয়ে মুখ খুললেন বিশ্বজিৎ, ফাঁস করলেন অজানা সব তথ্য!

মহাসমারোহে ও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সম্প্রতি সফলভাবে সম্পন্ন হল বহুল প্রতীক্ষিত ‘উত্তম ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’। বাংলার খ্যাতনামা শিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ এই উৎসবটিকে এক অন্য মাত্রায় বর্ণময় করে তুলেছে। বাঙালির চিরকালীন উৎসবের বর্ণিল তালিকায় যুক্ত হল আরও একটি জমকালো অধ্যায়। এই বিশেষ উৎসবের আকর্ষণ বাড়াতে সুদূর মুম্বই থেকে উড়ে এসেছেন প্রবীণ ও কিংবদন্তি অভিনেতা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, উৎসবের শুরু থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত প্রাণভরে উপভোগ করেছেন তিনি। পাশাপাশি, এই গোটা অনুষ্ঠানে তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র তথা টলিউড সুপারস্টার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নেতৃত্বদান এবং কর্মতৎপরতা দেখে তিনি যে ভীষণভাবে গর্বিত, তা প্রকাশ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা বোধ করেননি। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আবেগপ্রবণ গলায় তিনি স্পষ্ট জানান, “আমার ছেলে উত্তম দা’কে ঘিরে এই গোটা অনুষ্ঠানটা লিড করছে। এর জন্য আমি ভীষণ গর্বিত।”
সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলামেলা আলাপচারিতায় স্মৃতিচারণ করে বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় আরও বলেন, “আজ যখন গাড়ি করে রাস্তা দিয়ে আসছিলাম, তখন দেখলাম গোটা শহরটাই যেন পুরোপুরি ‘উত্তমময়’ হয়ে উঠেছে। এমন প্রাণবন্ত কলকাতা আমি আমার জীবনে আগে কখনও দেখিনি। এই উৎসবের আমেজ দেখে একবারের জন্যও মনে হচ্ছে না যে উত্তম দা আমাদের মধ্যে নেই। এর জন্য আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাবো নতুন সরকারকে এবং রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীকে। আমার ছেলে এই আয়োজনে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করছে অর্থাৎ পুরো অনুষ্ঠানটাকে সামনের দিক থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, এর জন্য আজ একজন বাবা হিসেবে আমার বুকটা গর্বে ভরে যাচ্ছে। আমাকে অত্যন্ত ভালোবেসে এই মহোৎসবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, আর আমি একা নয়, আমার স্ত্রী ও কন্যাও আনন্দের সঙ্গে এখানে এসেছে।” এপ্রসঙ্গে ‘ইটিভি ভারত’-এর পক্ষ থেকে মহানায়কের রাজনৈতিক ঝোঁক বা আগ্রহ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, “একেবারেই না। উনি রাজনীতির মধ্যে ছিলেন না, বরং মানুষের নিঃস্বার্থ সেবা করতে ভালোবাসতেন। কিন্তু সেই সেবামূলক কাজের কথা উনি কখনই ঢাক পিটিয়ে কাউকে জানাননি।”
নিজের শিকড় ও জন্মভূমির টানের কথা বলতে গিয়ে বিশ্বজিৎ বলেন, “এই কলকাতাতেই আমার জন্ম হয়েছে। এটাই আমার প্রাণের শহর। এখানেই আমি আমার অভিনয় জীবনের কেরিয়ার শুরু করেছিলাম। পরবর্তীকালে শ্রদ্ধেয় হেমন্ত দা আমাকে সঙ্গে করে মুম্বই নিয়ে যান। উত্তম দা আমার শুধু সহকর্মী ছিলেন না, তিনি আমার বড় দাদার মতো ছিলেন। আমাদের সম্পর্কের মধ্যে যেমন গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল, তেমনই মাঝে মাঝে মনোমালিন্যও হয়েছে। তবে সেই ধমকানোর বা কলার ধরে কথা বলার অধিকারটুকু আমাদের দুজনের প্রতি দুজনেরই ছিল। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রতি আমার মনের টান আজও ঠিক আগের মতোই অটুট রয়েছে। এটা আমার নাড়ির টান। ‘বিশ সাল বাদ’ ছবির সাফল্যের পর মহারাষ্ট্রে পাকাপাকিভাবে কেরিয়ার গড়ে উঠলেও আমি আমার জন্মভূমি বাংলাকে কখনও ভুলে যাইনি। যখনই এখানে কোনো ভালো অনুষ্ঠান হয়েছে, আমি সমস্ত কাজ ফেলে ছুটে এসেছি।”
পুরনো দিনের সোনালী স্মৃতির পাতা উল্টে অভিনেতা জানান, “আগে এই শহরে প্রায়ই নানা জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হতো। একবার আমি তালাক মেহমুদকেও এখানে নিয়ে এসেছিলাম। এখানে ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করেছি। এমনকি একবার কিংবদন্তি গায়ক কিশোর কুমারকে এখানে এসে গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করি। আমি আগেই ওঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলাম যে এই অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে, অর্থাৎ কোনো পারিশ্রমিক বা টাকা না নিয়ে গান গাইতে হবে। উনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, কেন আমি গাইব? আমি তখন জবাব দিই, মানুষের ভালোবাসার জন্য গাইতে হবে। সমস্ত দুনিয়া জানে যে কিশোর কুমার টাকা ছাড়া একটি কথাও বলেন না। অথচ এহেন কিশোর কুমারকেও আমি শর্তসাপেক্ষে টাকা ছাড়া এখানে নিয়ে আসতে পেরেছিলাম। তবে উনি আমার কাছে একটি কঠিন শর্ত রেখেছিলেন—সেটা হলো উনি স্টেজে সরাসরি পিয়ানো বাজিয়েই গান গাইবেন। আমি ওঁর সেই শর্ত হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলাম এবং পিয়ানোর ব্যবস্থাও করেছিলাম।”
সবশেষে মহানায়কের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বিশ্বজিৎ বলেন, “বুম্বাধরা প্রসেনজিতের অন্নপ্রাশনের দিন স্বয়ং উত্তম দা সুন্দরভাবে সানাইয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এমনকি বুম্বার পৈতের দিন উত্তম দা’র গোটা পরিবার আমার বাড়িতে সদলবলে হাজির হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে বুম্বা ভক্তিভরে গৌরী বৌদির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিল। আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ঠিক এমনই নিবিড় ও মধুর ছিল। তাই মহানায়কের এই জন্মশতবর্ষ উদযাপনের বর্ণাঢ্য আয়োজন নিজের চোখে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করব, তা তো কোনোভাবেই হতে পারে না। আজ এখানে এসে আমি সত্যি ভীষণ খুশি।”