মুখেই মিলিয়ে যায় মহানায়কের প্রিয় মিষ্টি! কোন জাদুকরী স্বাদে আজও কাটোয়ার প্রেমে পড়ে গোটা বিশ্ব?

বাংলার মিষ্টির দীর্ঘ এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে এমন কিছু অনন্য স্বাদ রয়েছে, যা শুধু জিভে লেগে থাকে না, মানুষের মন ও চিরন্তন স্মৃতিতেও গভীর ছাপ ফেলে যায়। পূর্ব বর্ধমানের ঐতিহাসিক কাটোয়া শহরের বিখ্যাত ‘পরাণের পান্তুয়া’ তেমনই এক অতুলনীয় মিষ্টি, যার সুবাস আজ আর কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লম্বাটে আকৃতি, ভেতরে তুলতুলে নরম ক্ষীরের পুর এবং রসে ভরপুর এই বিশেষ পান্তুয়ার খ্যাতি এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আমেরিকা ও জাপানের মতো উন্নত দেশের মাটিতেও সমানভাবে সমাদৃত। আর এই বিশ্বজোড়া খ্যাতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের সোনালী স্মৃতির রোমাঞ্চকর ইতিহাস। মহানায়কের জন্মবার্ষিকীতে সেই সুপ্রাচীন নস্টালজিয়া এবং জাদুকরী মিষ্টির সুবাস যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় কাটোয়াবাসীর মনে।

এই পান্তুয়ার সুদীর্ঘ ইতিহাস পেছনে ফেলে এসেছে দেশভাগের আগের এক কঠোর সংগ্রামের করুণ ও অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়। অবিভক্ত বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলা থেকে পেটের তাগিদে এবং উন্নত ভবিষ্যতের সন্ধানে কাটোয়ায় এসেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ কুণ্ডু। কাটোয়া শহরের ঐতিহ্যবাহী গঙ্গাতীরবর্তী বারোয়ারিতলায় তিনি একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র মিষ্টির দোকান দিয়ে নিজের জীবনযুদ্ধ শুরু করেন। সেখানে নিজের হাতে পরম যত্নে তিনি তৈরি করতে শুরু করেন সেই বিশেষ লম্বা আকারের ক্ষীরের পান্তুয়া। তখন হয়তো দূরতম কল্পনাতেও ছিল না যে তাঁর নিজ হাতের এই সৃষ্টি একদিন গোটা কাটোয়া শহরের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ও culinary পরিচয়ে পরিণত হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পান্তুয়ার অভাবনীয় স্বাদ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে চারদিকে। সুরেন্দ্রনাথ কুণ্ডুর তিন সন্তানের মধ্যে ছোট ছেলে প্রাণকৃষ্ণ কুণ্ডু পিতার কাছ থেকেই পরম যত্নে আয়ত্ত করেছিলেন এই বিশেষ পান্তুয়া তৈরির গোপন ও অনন্য রেসিপি। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি যখন নিজে এই মিষ্টি তৈরি শুরু করলেন, তখন স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ‘প্রাণকৃষ্ণ’ নামটি কালক্রমে সংক্ষিপ্ত হয়ে হয়ে ওঠে ‘পরাণ’। ফলস্বরূপ, তাঁর হাতের সুস্বাদু পান্তুয়াই মানুষের অন্তরে স্থায়ী পরিচিতি লাভ করে ‘পরাণের পান্তুয়া’ নামে।

কাটোয়ার আপামর মিষ্টিপ্রেমীদের কাছে এই নামটি নিছক কোনো খাবারের পরিচয় নয়, বরং এটি এক গভীর আবেগ ও অহংকারের প্রতীক। আর এই সুখ্যাতি যে কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা কিন্তু নয়। জনশ্রুতি রয়েছে যে, একটি চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সুবাদে কাটোয়ায় এসে স্বয়ং মহানায়ক উত্তম কুমারও এই বিশেষ পান্তুয়ার জাদুকরী স্বাদ গ্রহণ করেছিলেন। পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া শহরের এই খাঁটি মিষ্টির স্বাদ মহানায়কের মুখে ওঠার সেই রোমাঞ্চকর স্মৃতি আজও স্থানীয় মানুষের মনে গর্বের সঙ্গে বেঁচে রয়েছে। তাই মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মদিবসে ‘পরাণের পান্তুয়া’র সোনালী ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর সেই ঐতিহাসিক কাটোয়া সফরের স্মৃতিচারণ অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ফিরে আসে। কেবল মহানায়কই নন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু প্রখ্যাত নেতা, মন্ত্রী এবং দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও কাটোয়ার এই বিখ্যাত পান্তুয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন এবং এর স্বাদ উপভোগ করেছেন। একটি অতি সাধারণ ও ক্ষুদ্র মিষ্টির দোকান থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ পথচলা আজ মহীরূহে পরিণত হয়ে পৌঁছে গেছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মবার্ষিকীতে কাটোয়ার এই পান্তুয়ার গৌরবোজ্জ্বল গল্প তাই ফিরিয়ে আনে এক অনবদ্য নস্টালজিয়া। রূপালি পর্দার মহানায়ক বহু বছর আগে যে ঐতিহাসিক শহরে এসে এই মিষ্টির প্রেমে পড়েছিলেন, সেই শহর আজও পরম যত্নে আগলে রেখেছে তাঁর স্পর্শধন্য সেই সোনালী স্মৃতি এবং অতুলনীয় স্বাদ।