এবার কি দেশজুড়ে তৈরি হবে ‘সবর্ণ কমিশন’? বিজেপির বিস্ফোরক দাবিতে জাতীয় রাজনীতিতে চরম তোলপাড়!

দেশের রাজনৈতিক মহলে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং কোটা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ভারতীয় জনতা পার্টির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য কেন্দ্র সরকারের কাছে দেশের পরিসরে একটি জাতীয় স্তরের ‘সবর্ণ কমিশন’ গঠনের জোরালো দাবি পেশ করেছেন। এই সংসদ সদস্যদের মূল যুক্তি হলো, যেহেতু দেশে তফসিলি জাতি (এসসি), তফসিলি উপজাতি (এসটি) এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণি বা ওবিসি-র (OBC) সুরক্ষার জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র সাংবিধানিক কমিশন রয়েছে, ঠিক একইভাবে সাধারণ বা উচ্চবর্ণের গরিব মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য একটি জাতীয় কমিশন থাকা একান্ত প্রয়োজন। এই নতুন দাবিটি ঘিরে বর্তমানে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা এবং নতুন জল্পনা।

এই অভিনব দাবির নেপথ্যে রয়েছে বিহার রাজ্যের সফল প্রশাসনিক উদাহরণ। বিহার সরকার অনেক আগেই নিজ রাজ্যে একটি কার্যকর ‘সবর্ণ কমিশন’ গঠন করে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। বর্তমান কেন্দ্রীয় প্রস্তাবটিকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে বিহারের সেই প্রতিষ্ঠিত মডেলটি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক। বিগত ২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারি নীতীশ কুমার সরকারের উদ্যোগে বিহারে এই কমিশন প্রথম অনুমোদিত হয় এবং একই বছরের ৩১ জানুয়ারি এর আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই রাজ্যস্তরের কমিশনের মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ বা উচ্চবর্ণের সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা অভাবী পরিবারগুলির প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা এবং তাদের উন্নয়নের স্বার্থে সরকারকে নীতিগত পরামর্শ দেওয়া।

কার্যপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এই কমিশন গোটা রাজ্য জুড়ে ব্যাপক সমীক্ষা চালায়। এই সমীক্ষার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হয় যে সমাজের কোন কোন অঞ্চলের মানুষের কাছে সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং ইডব্লিউএস (EWS) সংরক্ষণের সুবিধা সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না। এর ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা বিশেষ রিপোর্ট রাজ্য সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে গরিব উচ্চবর্ণের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিখরচায় কোচিং, হোস্টেল সুবিধা এবং বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজ তৈরিতে বড় ভূমিকা নেয়। এছাড়া সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে বিহারের ৩৮টি জেলাতেই ডেডিকেটেড নোডাল অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে, যাতে ছোটোখাটো প্রশাসনিক অভিযোগের জন্য সাধারণ মানুষকে অহেতুক পাটনা পর্যন্ত দৌড়াতে না হয়।

তফসিলি জাতি, উপজাতি এবং ওবিসি কমিশনের সঙ্গে সবর্ণ কমিশনের মূল পার্থক্য নিহিত রয়েছে এদের আইনি কাঠামোর মধ্যে। এসসি ও এসটি কমিশনগুলি সংবিধানের নির্দিষ্ট সংশোধনীর মাধ্যমে পূর্ণ সাংবিধানিক মর্যাদা ভোগ করে এবং তাদের সিভিল কোর্টের মতো বিশেষ আইনি ক্ষমতা রয়েছে। এর ফলে তারা যেকোনো মামলার তদন্তে তলব বা নথি সংগ্রহের আইনি অধিকার প্রয়োগ করতে পারে। বিপরীতে, বিহারের সবর্ণ কমিশন একটি সম্পূর্ণ অ-সাংবিধানিক বা কার্যনির্বাহী সংস্থা, যা সরাসরি সরকারের নির্বাহী আদেশে গঠিত হয়েছে। ফলে এর সমকক্ষ আইনি বা দণ্ডমূলক ক্ষমতা নেই। বর্তমানে বিজেপি সাংসদদের এই নতুন জাতীয় দাবির পর প্রশ্ন উঠছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার যদি ভবিষ্যতে এমন কোনো কমিশন গড়ে তোলে, তবে তা কি শুধুই একটি উপদেষ্টা সংস্থা হিসেবে কাজ করবে, নাকি তাকেও সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া হবে।