যুদ্ধ থামিয়ে সোজা থাইল্যান্ডে! মার্কিন যুদ্ধজাহাজের আগমনে থরথর করে কাঁপছে পাতাভা!

প্রায় ২৮৬ দিন ধরে সমুদ্রের নোনা জল, তীব্র যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এবং লাগাতার মানসিক চাপের সঙ্গে লড়াই করার পর অবশেষে থাইল্যান্ডের উপকূলে এসে পৌঁছেছে মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিশাল বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। তবে এই বিশালাকার যুদ্ধজাহাজটি ল্যাম চাবাং বন্দরে নোঙর ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই এবং প্রায় ৫০০০ মার্কিন নাবিক ও মেরিন জওয়ান পাতাভা শহরে পা রাখতেই গোটা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধক্ষেত্রের কড়া নজরদারির মধ্যে দায়িত্ব পালন করার পর মার্কিন জওয়ানরা যখন থাইল্যান্ডের মাটিতে আনন্দ-ফুর্তি ও কিছু স্বস্তির মুহূর্ত কাটাতে নামলেন, তখন থেকেই এই জনপ্রিয় পর্যটন শহরটির নাইটলাইফ এবং এখানকার সুপরিচিত সেক্স টুরিজমকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র জল্পনা ও আলোচনা শুরু হয়ে গেছে।
যুদ্ধের এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর পথচলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ নামের এই যুদ্ধজাহাজটি মূলত গত বছরের নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো বন্দর থেকে তার নির্ধারিত যাত্রা শুরু করেছিল। শুরুতে এই রণতরীটিকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করার কথা ছিল। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে হঠাৎ করে আমেরিকা-ইসরায়েল বনাম ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ এবং চরম যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় জাহাজটির গতিপথ ঘুরিয়ে সোজা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই এই রণতরীটি ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং মার্কিন নৌবাহিনীর সমুদ্র নাকেবন্দি কার্যক্রমে একেবারে সামনের সারিতে যুক্ত ছিল। চলতি বছরের মে মাসেই এই ঐতিহাসিক মোতায়েনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘায়িত হওয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের নির্দেশে এই মোতায়েনের মেয়াদ বারবার বৃদ্ধি করা হয়। পরিশেষে, টানা ২৮৬ দিনের একটি রেকর্ড ভাঙা ও অত্যন্ত দীর্ঘ সামুদ্রিক অভিযানের পর অবশেষে যুদ্ধজাহাজটি থাইল্যান্ডের জলসীমায় এসে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো যে, এই দীর্ঘ মেয়াদী সামরিক অভিযানের পুরো সময় জুড়ে জাহাজে থাকা পুরো ক্রু বা চালক দল একটানা ২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে কাটান এবং এই দীর্ঘ মেয়াদে একবারের জন্যও কোনো বন্দরে গিয়ে নোঙর ফেলেননি। দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময় ধরে এক ফোঁটা স্থলভূমির মুখ না দেখে মাঝসমুদ্রে কড়া সামরিক নিয়মের মধ্যে আটকে থাকার পর অবশেষে জওয়ানরা যখন থাইল্যান্ডের মাটিতে পা রাখার সুযোগ পেলেন, তখন তাদের এই বহু প্রতীক্ষিত আনন্দও কঠোর নিয়মকানুন এবং কড়া নিরাপত্তা বলয়ের বেড়াজালে বন্দি রাখা হয়েছে। পাতাভা প্রশাসন এবং থাইল্যান্ডের পুলিশ বাহিনী এই ৫০০০ মার্কিন সেনার আগমনকে কেন্দ্র করে কোনো রকম ঝুঁকি নিতে একেবারেই রাজি নয়। শহরের সমস্ত জনপ্রিয় নাইটক্লাব, বিনোদন কেন্দ্র এবং বার এলাকাগুলিতে শত শত সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে শহরের কুখ্যাত ‘সয় সিক্স’ (Soi 6) এলাকাটি মার্কিন সামরিক কর্মীদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে সাধারণত যৌনকর্মীরা প্রকাশ্যে খদ্দেরদের আকর্ষণ করে থাকেন। থাই প্রশাসন স্পষ্টভাবে মার্কিন জওয়ানদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, থাইল্যান্ডের কঠোর আইনি কাঠামো অনুযায়ী পতিতাবৃত্তি সম্পূর্ণরূপে অবৈধ। এছাড়া ক্যানাবিস বা গাঁজা বিক্রির দোকানগুলির আশপাশেও মার্কিন সেনাদের না যাওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের এই নজিরবিহীন কড়াকড়ির নেপথ্যে রয়েছে বিশাল সংখ্যক মার্কিন সেনার সুশৃঙ্খল চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার বাধ্যবাধকতা। পাতাভার মেয়র পোরামেস নাগামপিচেটস জানিয়েছেন যে, জওয়ানদের ল্যাম চাবাং বন্দর থেকে পাতাভা শহরে আনা-নেওয়ার জন্য প্রায় ৪০টি বড় বাসের একটি বিশেষ বহর তৈরি রাখা হয়েছে। যেসব মার্কিন সেনা রাতে উপকূলে বা হোটেলেই রাত্রিযাপন করতে ইচ্ছুক, তাদের থাকার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে দুটি হোটেল নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা কোনোভাবেই এই বিদেশি অতিথিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম বা পকেট কাটার সুযোগ না নেন। উল্লেখ্য, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল পাতাভার পর্যটন শিল্পের ওপরও। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, বিশ্বজুড়ে চলা যুদ্ধের আবহে পাতাভার বিখ্যাত ওয়াকিং স্ট্রিটের প্রাণচাঞ্চল্য অনেকটাই ম্রিয়মান হয়ে পড়েছিল। এমন এক কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ৫০০০ মার্কিন নাবিক ও মেরিন জওয়ানের আকস্মিক আগমন স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে আশার এক নতুন আলো নিয়ে এসেছে। বহু দোকানদার তাদের দোকানের সামনে মার্কিন সেনাদের জন্য বিশেষ ছাড়ের বড় বড় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেন। বহু বছর আগের ভিয়েতনামী যুদ্ধের স্মৃতি উসকে দিয়ে পাতাভা ফের একবার মার্কিন সেনাদের প্রধান বিনোদন ও রিফ্রেশমেন্টের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে, এক দীর্ঘ রক্তাক্ত যুদ্ধের পর মার্কিন এই জওয়ানদের পাতাভা সফর বিশ্ব রাজনীতির এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় অধ্যায় হয়ে উঠেছে।